বৃহস্পতিবার ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৭


রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম, মাযহাবি ইসলাম নাকি লা মাযহাবি ইসলাম?


আমাদের অর্থনীতি :
11.01.2017

 

সৈয়দ রশিদ আলম

লেখক: কলামিস্ট

ইদানিং মধ্যপ্রাচ্যের সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার, বাহরাইন, ইয়েমেন, ওমান, আরব আমিরাত, ইরানে এবং প্রতিবেশী পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মাযহাবি ও লা মাযহাবিদের মধ্যে দ্বন্দ্ব প্রকট আকার ধারণ করেছে। বাংলাদেশে করা হয়েছে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম। আমাদের দেশেও লা মাযহাবি ও মাযহাবিদের মধ্যে দ্বন্দ্ব প্রতিদিন বেড়ে যাচ্ছে। পরস্পরকে তারা কেউ বিশ্বাস করে না। মাযহাব বলতে, হানাফি মাযহাব, শাফেয়ি মাযহাব, মালেকি মাযহাব, হাম্বলি মাযহাব, সোহরাওয়ার্দীয়া মাযহাব ও জাফরি মাযহাবসহ একাধিক মাযহাব তৈরি হয়েছে। এক মাযহাবের অনুসারী আর এক মাযহাব অনুসারীদের অনুসরণ করেন না, বিশ্বাসও করেন না। যেমনÑ সৌদি আরবে লা মাযহাবিরা ক্ষমতায় রয়েছেন, যার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন নবী পরিবারের চির শত্রু আবদুল ওয়াহাব নজদী। সৌদি আরবসহ মধ্য প্রাচ্যের দেশগুলো মাযহাব মানতে রাজি নন, কেননা তাদের বক্তব্য নবীজি (স.) এর সময় কোনো মাযহাবের অস্তিত্ব ছিল না। একই কথা প্রযোজ্য তরিকা পন্থিদের বেলায়।

সৌদি আরবের বক্তব্য অনুযায়ী, চিশতিয়া তরিকা, কাদেরিয়া তরিকা, নকশে বন্দিয়া তরিকা, মুজাদ্দেদীয়া তরিকা মানুষের তৈরি করা, যে কারণে তারা কোনো মাযহাব বা তরিকা মানতে রাজি নন। আমাদের দেশের জামায়াতে ইসলাম ও তাবলীগ জামায়াত কোনো মাযহাব মানে না। তারা নিজেরাও লা মাযহাবি। আফ্রিকার বেশকিছু দেশ, যেমনÑ মালি ও নাইজেরিয়ায় মাযহাবি ও লা মাযহাবিদের মধ্যে সংঘাত অনেকটা বেড়ে গেছে। কারণ মাযহাব পন্থিরা যা করেন লা মাযহাবিরা তা করেন না। এছাড়া সৌদি আরবে হাদিসগ্রন্থের মধ্যে একমাত্র বোখারি শরিফকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। আবার উপমহাদেশে ছয়টি হাদিস পুস্তককে সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়।

ইরানসহ শিয়াপন্থি দেশগুলোতে কোনো হাদিসগ্রন্থকে মানা হয় না। তাদের বক্তব্য আমাদের জন্য কুরআনুল কারিমই যথেষ্ট। একটি দেশে রাষ্ট্রধর্ম যখন ইসলাম হিসেবে ঘোষিত হবে তখন সঙ্গত কারণে সবাই জানতে চাইবেন, লা মাযহাবিদের কি অনুসরণ করা হবে নাকি মাযহাবিদের অনুসরণ করা হবে? সুন্নিদের অনুসরণ করা হবে নাকি ওয়াহাবিদের অনুসরণ করা হবে? কিন্তু এর কোনো উত্তর আজও আমরা পাইনি। বাংলাদেশে একাধিক রাজনৈতিক দল রয়েছে, যারা অনেকেই মাযহাব মানে কিন্তু তরিকা মানেন না, আবার এমনও অনেকেই আছেন যারা মাযহাব মানেন না, এ রকম কিছু ইসলামী সংগঠন হচ্ছে, জামায়াতে ইসলাম, হেফাজত ইসলাম, জমিয়তে ওলামায়ে ইসলাম, ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন, খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত আন্দোলনসহ প্রায় ৫০টি ইসলামি দল, কিন্ডার গার্টেনের মতো ইসলামি দল তৈরি হয়েছে। এক দলের সঙ্গে আর এক দলের সম্পর্ক দুই সতিনের মতো। এরা প্রত্যেকেই বাংলাদেশে আল্লাহর দীন কায়েমের কথা বলেন, কিন্তু নিজেদের মধ্যে এত বেশি অনৈক্য যে, এক টেবিলে তারা কোনোদিনই বসতে পারেন না। তারা কি মাযহাব মানেন নাকি মানেন না, আজও দেশবাসী ঠিকমতো বুঝতে পারেনি।

বাংলাদেশে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম যদি পূর্ণাঙ্গরূপ লাভ করে, তারপরও দেখা যাবে ইসলামি দলগুলো একমত হতে পারছে না। পারবেন না আমাদের সম্মানিত পীর সাহেবরা। টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া পর্যন্ত বাংলাদেশের প্রতিটি প্রান্তরে পীর সাহেবরা খানকাহ শরিফ গড়ে তুলেছেন। এরা কেউ চিশতিয়া তরিকার অনুসারী, কেউ কাদেরিয়া তরিকার অনুসারী, কেউ নকশেবন্দিয়া তরিকার অনুসারী, কেউ মুজাদ্দেদীয়া তরিকার অনুসারী। দাদা পীর, নানা পীর, বাবা পীর এরপর ছেলে পীর অর্থাৎ রাজ সিংহাসন বংশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। সোনার খনি কোনোভাবেই যেন হাতছাড়া না হয়ে পড়ে, এ কারণে একাধিক যোগ্য মুরিদ থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশের ইতিহাসে কোনো পীর সাহেব কোনো মুরিদকে তার গদিটি দেননি, দিয়েছেন পুত্র সন্তানকে। পুত্র সন্তানের যোগ্যতা থাক আর না থাক, পীর হবে তার ছেলে এটাই তিনি চান। পীরবাদের অনুসারীরা রাষ্ট্রধর্ম নিয়ে কখনই কোনো মন্তব্য করতে রাজি নন। সারা পৃথিবীতে মুসলমানরা অন্য ধর্মের মানুষ দ্বারা যতটা আক্রান্ত তার চাইতে বেশি তারা নিজেরা নিজেদের মধ্যে শত্রুতা তৈরি করে আক্রান্ত হচ্ছেন। এটাই চলতে থাকবে। কারণ কেউ কাকে মানবেন এটা ইতিহাস স্বাক্ষী দেয় না।

সম্পাদনা: আশিক রহমান