সোমবার ২৪ জুলাই ২০১৭
  • প্রচ্ছদ » মিনি কলাম » আমাদের অর্থনীতিকে দেওয়া বিশেষ সাক্ষাৎকারে শিক্ষাবিদ ও আওয়ামী লীগের উপদেষ্টাম-লীর সদস্য ড. অনুপম সেন
    বাংলাদেশের মানুষ শুভবুদ্ধি সম্পন্ন, আন্দোলনের নামে উগ্রতা কখনোই পছন্দ করে না তারা


আমাদের অর্থনীতিকে দেওয়া বিশেষ সাক্ষাৎকারে শিক্ষাবিদ ও আওয়ামী লীগের উপদেষ্টাম-লীর সদস্য ড. অনুপম সেন
বাংলাদেশের মানুষ শুভবুদ্ধি সম্পন্ন, আন্দোলনের নামে উগ্রতা কখনোই পছন্দ করে না তারা


আমাদের অর্থনীতি :
11.01.2017

 

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আশিক রহমান

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে দেশে আগুন সন্ত্রাস চলেছিল, মানুষ পুড়িয়ে মারার মতো যে বর্বরতা চলেছিল তা নজিরবিহীন। ২০১৫ সালের ৫ জানুয়ারি থেকে টানা তিনমাস যে নৃশংসতা, পেট্রলবোমার মতো জঘন্য কর্মকা- হয়েছিল এদেশের মানুষ তা ভুলে যায়নি। ওই সময় বাংলাদেশের যে নৈরাজ্যের সম্ভাবনা এসেছিল, সে ধরনের নৈরাজ্য আমরা ইরাক, সিরিয়ায় দেখতে পাই। এই নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছিল বিএনপি জোট। তারা দেশকে অন্ধকারে ঠেলে দেওয়ার পাঁয়তারা করেছিল, কিন্তু তাদের সেই অপচেষ্টা সফল হয়নি। সফল হতে দেয়নি এদেশের মানুষÑ দৈনিক আমাদের অর্থনীতিকে দেওয়া বিশেষ সাক্ষাৎকারে এমন মন্তব্য করেন শিক্ষাবিদ ও আওয়ামী লীগের উপদেষ্টাম-লীর সদস্য ড. অনুপম সেন।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের মানুষ শুভবুদ্ধি সম্পন্ন; আন্দোলনের নামে উগ্রতা কখনোই পছন্দ করে না তারা। এদেশের উগ্রবাদের প্রসার হবে, জ্বালাও-পোড়াও আন্দোলনের মধ্যদিয়ে নিরীহ সাধারণ মানুষকে হত্যা করা হবে এমনটি কখনো সহ্য করে না এদেশের জনগণ। বাংলাদেশের আবহমান সংস্কৃতির সঙ্গে জঙ্গিবাদ-উগ্রবাদ, সন্ত্রাস, জ্বালাও-পোড়াও এর নীতি; আন্দোলন সমর্থন পাবে না। এদেশের প্রকৃতি যেমন কোমল, স্নিগ্ধ, এদেশের মানুষের মনে মাঝে-মধ্যে বিদ্রোহ, বিক্ষোভ দেখা দিলেও প্রকৃতিগতভাবেই এদেশের মানুষও কোমল, শান্ত, স্নিগ্ধ।

তিনি আরও বলেন, ৫ জানুয়ারি বিএনপি গণতন্ত্র হত্যা দিবস পালন এটা কিভাবে তারা করছে? এটা তো ঠিক নয়। কারণ ২০০৬ সালে তারাই তো গণতন্ত্র হত্যা করল, অন্যায়ভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ধারণায় আঘাত করল, স্বাভাবিক সময়ে নয় অস্বাভাবিক সময়ে বিচারপতিদের বয়স দুবছর বাড়িয়ে দিল। সবাইকে বাদ দিয়ে প্রেসিডেন্ট তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধান হলেন। তখন তারা তাদের মতো তত্ত্বাবধায়ক সরকার নির্ধারণ করল, সেটা আবার পরিবর্তিত হয়ে গেল, আধা-সামরিক সরকার ক্ষমতায় এলো। যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার থাকার কথা ছিল ৩ মাস, তারা থাকল প্রায় দুই বছর। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে তো বহু দল অংশগ্রহণ করেছে। আপনি বলছেন, ১৫৩ বা ১৫৪ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন ওই নির্বাচনে। কিন্তু এখানে সংবিধানের ধারা অনুসরণ করেই নির্বাচনটি হয়েছে, বহু দলই নির্বাচনে অংশ নিয়েছে।

ড. অনুপম সেন বলেন, নির্বাচন কোন ফরম্যাটে হবে তা নিয়ে পরামর্শের জন্য বেগম খালেদা জিয়াকে শেখ হাসিনা টেলিফোন করেছিলেন। আহ্বান জানিয়েছিলেন, আসুন আমরা সবাই মিলে একটি সরকার গঠন করি, যার অধীনে অনুষ্ঠিত হবে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী করে নির্বাচন দিই আমরা। কিন্তু বেগম খালেদা জিয়া তো সেই ডাকে সাড়া দেননি। আর দ্বিতীয়বার নির্বাচন দেব তার পরিবেশও তো রাখেনি বিএনপি। কারণ ২০১৫ সালে বিএনপি যে জ্বালাও-পোড়াও করল, তারপরও কি অল্প সময়ের মধ্যে একটা জাতীয় নির্বাচন দেওয়ার পরিবেশ ছিল?

তিনি বলেন, আজকে বিএনপি সংসদে নেই। সংসদে তাদের এই অনুপস্থিতির দায় তাদেরকেই নিতে হবে। কারণ এই পরিস্থিতি তারা নিজেরাই সৃষ্টি করেছে। ১৯৭৬ সালে যখন বিএনপি ক্ষমতায় এলো তখন থেকেই বিএনপি যথার্থভাবে গণতন্ত্র চর্চা করেনি, যদিও তারা বহুদলীয় গণতন্ত্রের কথা বলে। কিন্তু সত্যিকারার্থে তারা কখনো গণতন্ত্র চর্চা করেনি। সেই সময় ঢাকা শহরে রাত বারোটার পর থেকে সকাল পর্যন্ত কারফিউ থাকত। সেটা দুই-তিন বছর চলল। ’৭৭ সালে তারা যে গণভোট, হ্যাঁ-না ভোট করেছিল, সেটা কোনো গণভোটই হয়নি। সেখানে নিরানব্বই শতাংশ ভোট পড়েছিল, নিরানব্বই শতাংশ লোক কোনোদিন ভোট দিতে পারে না। সেটা একটা হাস্যকর ব্যাপার ছিল।

এক প্রশ্নের জবাবে ড. অনুপম সেন বলেন, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর অনেক সমস্যা দেখা দেয়। কিন্তু ক্ষমতার সঙ্গে তৎকালীন বঙ্গবন্ধুর সরকার সমস্যার সমাধানও করেছিল, যদিও সে সময় বিশ্ব পরিস্থিতি অত্যন্ত প্রতিকূল ছিল বাংলাদেশ এবং গোটা দুনিয়ার জন্যও। কারণ তখন সারা বিশ্বজুড়ে খাদ্যঘাটতি ছিল। যুদ্ধ বিগ্রহ ছিল। নানা সমস্যা থাকা সত্ত্বেও বঙ্গবন্ধু মাত্র কয়েক মাসে দেশবাসীর জন্য একটি অসাধারণ সংবিধান উপহার দিলেন। দেশের অগ্রযাত্রায় আওয়ামী লীগের ভূমিকা অনন্য। বিশেষ করে অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় দলটি অসাধারণ সাফল্য অর্জন করছে। ’৯৬ সালে সূচনাতেই খুব ভালো করেছে। তারপর ২০০৯ সাল থেকে দেশের রাষ্ট্রপরিচালনার তার সাক্ষী দেশবাসী। গোটা দুনিয়া সাক্ষী। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে ও পরে দেশের নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি, আগুন সন্ত্রাস মোকাবিলা করে আজ দেশকে শেখ হাসিনা সরকার কোথায় নিয়ে যাচ্ছে তা দেখে বিস্মিত গোটা দুনিয়া। আমরা পদ্মা সেতুর মতো বড় অবকাঠামো নিজের অর্থায়নে করছি। ঢাকা-চট্টগ্রাম চার লেন, ঢাকাসহ সারাদেশের যেখানে ফ্লাইওভার দরকার তো তৈরি হচ্ছে। উন্নয়নের অগ্রগতির বাংলাদেশের বেগবান হচ্ছে অবিশ্বাস্যভাবে। এটি হচ্ছে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বেই।

তিনি বলেন, পাকিস্তান এবং বাংলাদেশ আমল মিলিয়ে প্রায় ৪৫ বছর যে খাদ্যঘাটতি দেখেছিল এদেশের মানুষ, এখন তা থেকে মুক্ত হয়ে আমরা খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। যদিও এই সময়ে ৪৫ বছরে জমির পরিমাণ কমেছে, কিন্তু খাদ্যোৎপাদন চারগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় ৬০ শতাংশ লোক দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছিল, এখন সেটা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ২২ শতাংশে। এটা সম্ভব হয়েছে শুধু আওয়ামী লীগের সরকারের সময়োচিত সঠিক সিদ্ধান্তের ফলেই। চারদলীয় জোট কিছুই করেনি এদেশের উন্নয়নের জন্য। কারণ তাদের সময়ে কৃষিকে কোনো অগ্রাধিকার তারা দেয়নি। কিন্তু আওয়ামী লীগ ক্ষমতাসীন হয়ে সাধারণ মানুষের দারিদ্র্যমুক্ত হয় এমন নীতি গ্রহণ করে। আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক কৃষিতে ভর্তুকি দেওয়া একদম পছন্দ করে না। ভর্তুকির ঘোর বিরোধী তারা। তা সত্ত্বেও আওয়ামী লীগ তথা চৌদ্দ দলীয় সরকার কৃষিতে ভর্তুকি দিয়ে গেছে বিপুলভাবে। তার ফলে দেশ এখন খাদ্যে স্বয়ম্ভর। এ কারণেই এখন আর ভ্রুকটি করতে পারে না বিদেশি কোনো সাম্রাজ্যবাদী শক্তি।

আওয়ামী লীগের এই উপদেষ্টাম-লীর সদস্য আরও বলেন, বর্তমান আওয়ামী লীগ তথা চৌদ্দ দলীয় সরকার টানা দ্বিতীয়বার দেশ পরিচালনা করছে। আমরা এখন নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছি। বাংলাদেশ এখন পরনির্ভরশীল নয়, স্বনির্ভর। দেশকে পরনির্ভরশীলতার হাত থেকে বের করে আনা, দেশকে স্বয়ম্ভর করাই হচ্ছে আমাদের সবচেয়ে বড় অর্জন। জিডিপিতে শিল্পের অবদান কিছুদিন আগেও ছিল ১০ শতাংশ মাত্র সেটা এখন ৩০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। আমাদের রপ্তানি আয়ও এখন ৩২ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। এসব অসাধারণ অর্জন, একটা সময় কল্পনাও করা যেত না। প্রকৃত অর্থেই আমরা এখন স্বাধীন।

তিনি বলেন, একাত্তরে আমাদের বিরুদ্ধে যে অন্যায়-অবিচার করা হয়েছিল তা থেকেও আমরা বের হয়ে আসছি। পাকিস্তানি বাহিনীর এদেশিয় দোসর রাজাকার আলবদর-আলশামসদের বিচার হচ্ছে। বিচার পাচ্ছে স্বজনহারা মানুষরা, এটা বিরাট বিষয়। রাজাকারদের এদেশে বিচার হবে কখনো কি কেউ ভেবেছিল? ভাবেনি। কিন্তু সেটা সম্ভব হয়েছে এদেশে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার সরকার ছিল বলেই।

তিনি আরও বলেন, সরকারের তিনটি অঙ্গ সংগঠন রয়েছে। তা হচ্ছে সংসদ, নির্বাহী বিভাগ এবং আইন বিভাগ। এই তিনটি বিভাগ যেভাবে চলা উচিত সেভাবেই চলছে। বিচার বিভাগেতর স্বাধীনতা নিশ্চিত হয়েছে, সংসদের কার্যকারিতাও নিশ্চিত করেছি। আগে সংসদ চলত রাবার স্ট্যাম্পের মতো, এখন সংসদ সংসদের মতোই চলে। সংসদীয় নির্বাহী কমিটিগুলোও কাজ করে স্বাধীনভাবে, আগে কমিটিগুলো ঠিকমতো কাজ করত না, এটা এই সরকারেরই অর্জন।

২০১৬ সালের আলোচিত জঙ্গিবাদের উত্থান বিষয়ে জানতে চাইলে বিশিষ্ট এই শিক্ষাবিদ বলেন, জঙ্গিবাদ তো শুধু বাংলাদেশেই হয়নি, জঙ্গিবাদ তো সারা বিশ্বজুড়েই হয়েছে। বাংলাদেশ বরং খুব জঙ্গিবাদকে নিয়ন্ত্রণ করেছে। কয়েকদিন আগেও তুরস্কে বড় রকমের জঙ্গি হামলা হলো। প্রতিনিয়তই পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে জঙ্গিবাদের ঘটনা ঘটছে। জঙ্গিবাদ এখন একটা বৈশ্বিক ঘটনা। হলি আর্টিজানের মতো বিরাট ঘটনা বাংলাদেশে এর আগে ঘটেনি। কিন্তু জঙ্গিবাদকে বাংলাদেশ নিয়ন্ত্রণে নিয়ে এসেছে। জঙ্গিবাদের ভিত্তি অনেক সময় মানুষের হতাশার মধ্যে থাকে, ধর্মান্ধতা থেকেও জঙ্গিবাদের জন্ম হয়। যেখান থেকেই জঙ্গিবাদের জন্ম হোক, এদেশে জঙ্গিবাদের কোনো জায়গা নেই। বর্তমান সরকার জঙ্গিবাদের মূলোৎপাটন করবেই।