বুধবার ১৩ ডিসেম্বর ২০১৭


নৈতিকতা না থাকা খুব ভয়ংকর


আমাদের অর্থনীতি :
12.01.2017

 

আশীফ এন্তাজ রবি

লেখক: সাংবাদিক ও উপস্থাপক

একজন ‘মডেল এবং অভিনেতাকে’ পুলিশ গ্রেফতার করেছেন। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি মাতাল অবস্থায় প্রথম আলোর সাংবাদিক জিয়ার মোটর সাইকেলকে ধাক্কা মেরেছিলেন। সেই ধাক্কার ফল হয়েছে ভয়াবহ। আজ ৩ দিন হয়ে গেল, জিয়ার জ্ঞান ফেরেনি। তার দুই মাসুম সন্তান আর স্ত্রী চোখের জলে ভাসছেন।

যিনি গ্রেফতার হয়েছেন, তার নাম গণমাধ্যম প্রকাশ করেছে। কিন্তু আমি তার নাম লিখছি না। এখনো তিনি ‘অভিযুক্ত’, তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ‘প্রমাণ’ হয়নি। তার নাম লিখলে গালাগালির বন্যা বয়ে যাবে। আমি চাই না, অপরাধ প্রমাণের আগেই ফেসবুকের মানুষ তাকে কোনো শাস্তি দিক। তবে আমি একটি সিরিয়াস কথা বলতে চাই। হাসপাতালে উপস্থিত একাধিক সাংবাদিক আমাকে জানিয়েছেন, সেই অভিনেতা নিজেই রাত্রে হাসপাতালে এসে হাজির হন এবং নিজেই স্বীকার করেন তার অপরাধের কথা। শুধু তাই নয়, তিনি আইসিইউতে গিয়ে বলে এসেছেন, ‘কিছু হবে না, বেঁচে যাবে।’ অভিযোগ রয়েছে, এই অভিনেতা মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালাচ্ছিলেন। হাসপাতালেও তার মুখ থেকে মদের গন্ধ বেরুচ্ছিল।

তবুও পুরো ঘটনা শুনে আমি অন্যদের মতো ‘ছিঃ ছিঃ’ করিনি। এর বদলে খানিকটা স্বস্তি পেয়েছিলাম। একজন অপরাধী নিজে এসে অপরাধ স্বীকার করেছেন, এটা সমাজের জন্য ভালো লক্ষণ। কিন্তু ঝামেলা বাঁধলো তখনই, যখন সেই অভিনেতা নিজেই নিজের কথা ঘুরিয়ে বলতে থাকলেন, তিনি হাসপাতালে অন্য কাজে গিয়েছিলেন, জিয়ার কাছে যাননি, তাকে দেখেননি, এমনকি তিনি এই অ্যাকসিডেন্টের সঙ্গে জড়িত নন, তিনি মোটর সাইকেলকে ধাক্কা দেননি, তার গাড়ি ভেঙেছে ট্রাকের ধাক্কায়।

এটাও স্বাভাবিক। হয়তো আবেগের বশে কিংবা অপরাধবোধ থেকে তিনি হাসপাতালে গিয়েছিলেন। আমাদের মনে রাখতে হবে, একজন অপরাধীরও বাবা থাকেন, মা থাকেন, আত্মীয়, স্বজন শুভাকাক্সক্ষী থাকেন। আমাদের চোখে তিনি অপরাধী হলেও, তার বাবা মার কাছে তিনি ‘আপনজন’। হয়তো তাদের পরামর্শে কিংবা আইনজীবীর বুদ্ধিতে তিনি তার কথা ঘুরিয়েছেন। কারণ মধ্যরাতে হাসপাতালে গিয়ে তিনি কি বলেছেন, সেটার মূল্য এক রকম আর পুলিশের কাছে তিনি কি বলবেন, সেটার গুরুত্ব অনেক বেশি। কাজেই কারও পরামর্শে তিনি বক্তব্য ঘুরালে, সেটা ‘দুঃখজনক’ কিন্তু ‘অস্বাভাবিক’ নয়।

আমাকে অবাক করেছে, অন্য বিষয়। বাংলাদেশের এক গাদা অভিনেতা, অভিনেত্রী, যারা নিজেদের ‘শিল্পী’ বলে দাবি করেন, তারা থানায় গিয়ে এই অভিনেতাকে মুক্ত করার ব্যাপারে তদবির করছেন। ঘটনাস্থলে উপস্থিত না থেকেও হলফ করে বলছেন, সে নির্দোষ, সে অ্যাকসিডেন্ট করে নেই। তার গাড়ি ভেঙেছে ট্রাকের ধাক্কায়, সে হাসপাতালে যায়নি ইত্যাদি।

হাসপাতালের সিসি ক্যামেরার ফুটেজ চেক করলেই জানা যাবে, সেই অভিনেতা হাসপাতালে গিয়েছিলেন কিনা। ট্রাকের ধাক্কায় গাড়ির চেহারা, আর মোটর সাইকেলের ধাক্কায় গাড়ির চেহারা নিশ্চয়ই এক রকম হবার কথা নয়। পরীক্ষা করলেই বোঝা যাবে, সেটা ট্রাক না মোটর সাইকেল নাকি রিকশার ধাক্কা। এই সাধারণ বুদ্ধি আমাদের ‘শিল্পী’ সমাজের নেই দেখে খুবই অবাক হচ্ছি। বুদ্ধি কম থাকা ক্ষতিকর কিছু না। নৈতিকতা না থাকা খুব ভয়ংকর। বিশেষ করে তারা যদি ‘শিল্পী’ হোন।

আমি নিজে ‘ধোয়া তুলসীপাতা’ নই। আমি জ্ঞানত কিংবা অজ্ঞানত অনেক ভুল করি, কিছু কিছু ভুল অপরাধের পর্যায়ে পড়ে। নিজের ভুল বোঝার পর আমি বেশ কয়েকবার করজোড়ে ক্ষমা চেয়েছি। আমি ভাগ্যবান যে, আমি ক্ষমা চাওয়ার সুযোগ পেয়েছি। আমি আরও ভাগ্যবান, আমি এমন কোনো বন্ধু আজও পাইনি, যে আমার কোনো ভুল সমর্থন করেছে। সবসময় মেজাজ ভালো থাকে না, মাঝে মাঝে মানুষের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করে ফেলি। আমার স্ত্রী আমাকে বাধ্য করে সেইসব মানুষদের কাছে নত হয়ে ক্ষমা চাইতে। আমি সত্যিই ভাগ্যবান।

মানুষ ভুল করবেই। মানুষই অপরাধ করে। এমন কোনো সমাজ নেই, যে সমাজে অপরাধ নেই। তবু যে সমাজ অন্যায় সমর্থন করে, সে ‘মডেল’, আমিও ‘মডেল’, এই যুক্তিতে অপরাধের পক্ষে দাঁড়ায়, সেই সমাজের কোনো মুক্তি নেই। আমি অভিযুক্ত মডেল কাম অভিনেতার নাম প্রকাশ করছি না। কিন্তু, যেসব ‘শিল্পী’রা মাঝরাত্রে একজন ‘ভয়ংকর অপরাধে অভিযুক্ত’র পক্ষে তদবির করতে গিয়েছিলেন, থানায় সিনক্রিয়েট করেছেন, সেলিব্রেটি দাপট দেখিয়েছেন, তাদের নাম দেখতে বড়ো ইচ্ছে করছে। তারা আসলে কেমন শিল্পী, এটা জানতে আমি খুবই আগ্রহী।

ফেসবুক থেকে