মঙ্গলবার ২৮ মার্চ ২০১৭


‘বিদ্যা লাভে লোকসান, নাই অর্থ নাই মান’


আমাদের অর্থনীতি :
12.01.2017

কাকন রেজা

বিখ্যাত একজন মানুষের একটি বিনয়ী ফেসবুক স্ট্যাটাসের বিপরীতে একজন কমেন্ট করেছিলেন এবং তা ছিল অনেকটা এ রকম, আপনি যখন লিখতে শুরু করলেন, আঁকতে শুরু করলেন তখন থেকেই আপনি এলিট শ্রেণির।

ভদ্রলোকের এমন কমেন্ট দেখে বুক ভরে উঠেছিল। নিজেকে ‘এলিট এলিট’ মনে হচ্ছিল। দু-চারটে লেখা যখন লিখি এবং তা দু-চার জায়গায় প্রকাশিতও হয়, কেউ কেউ নামের পেছনে কলামিস্ট (!) শব্দটিও বসান তাহলে হয়তো আমিও একজন ‘এলিট’। কিন্তু হায়রে বুকভরা আত্মতৃপ্তি নিমিষেই উঁধাও একটি ফোনেই, উল্টো ‘তৃপ্তি’ ছেড়ে ‘আত্ম’টা উঠে এসে প্রশ্ন করল, আসলে আমরা কী করি, কী লিখি?

এক শুভাকাক্সিক্ষর সকাল বেলার ফোন, ‘কী, তুমি খবর লেখা বাদ দিলা? মাঝে মধ্যে শুধু দেখি বিভিন্ন জায়গার লেখা ‘সাহিত্য (?)’ ফেসবুকে শেয়ার করো। খবর লিখবা। ত্যাড়াব্যাকা খবর না লিখলে কেউ চিনব না। ত্যাড়াব্যাড়া লিখলেই খবর হইয়া যাবা। আগে তো অনেক বড় বড় খবর লিখতা।’

ভাবলাম সত্যিই তো, আমার ফেসবুকে তো কোনো ‘খবরে’র শেয়ার নেই। মাঝে মধ্যে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে আমার যেসব কলাম বা উপ-সম্পাদকীয় প্রকাশিত হয় তাই তো শেয়ার করি, এছাড়া কালেভদ্রে দু-চারটা মন্তব্য, এছাড়া তো সত্যিই কিছু নেই। আর আমার সেই শুভাকাক্সিক্ষর প্রশ্নের মুখে আমিও চিন্তায়, আসলে আমরা কী লিখি? তা কী সত্যিই ‘কলাম’ ‘প্রবন্ধ’ ‘নিবন্ধ’ ‘উপ-সম্পাদকীয়’? তাহলে কী লিখি, নাকি সাহিত্যই লিখি! কনফিউশনে ফিউজ উড়ে কনফিউজড অবস্থা! তবে নিশ্চিত যা লিখি তা অবশ্যই ‘ত্যাড়াব্যাড়া’ নয়, তাহলে তো ‘খবর’ হতো। যা লিখি সে সাহিত্য হলেও নিশ্চয়ই বড় ‘ম্যাড়ম্যাড়ে’ সাহিত্য! কী বলেন?

এক সরকারি চাকুরেকে ফোন করলাম। প্রয়োজনীয় কথা শেষে তিনি বললেন, ভাই শুনলাম আপনি নাকি খবরের পাশাপাশি লেখালেখিও করেন, কী লিখেন? বললাম, ভাই তেমন কিছু না, দু-একটি মাধ্যমে কিছু বিষয়াদি নিয়ে এই টুকটাক লেখি আর কী! তিনি বললেন, তার এক পরিচিত সাংবাদিক (?) এর কথা। সেই ব্যক্তিটির গুণকীর্তন করে বললেন, ‘আমি ভাই অমুক জায়গায় থাকতে একটি বাল্যবিবাহ বন্ধ করেছিলাম, ওই সাংবাদিক সাহেব ব্যাপারটি নিয়ে চমৎকার একটি খবর করে দিয়েছিলেন। খবরটি খুব সাড়া জাগিয়েছিল। এমন কিছু করেন না।’

ভদ্রলোক যে মেয়েটির বিয়ে বন্ধ করেছিলেন সে ছিল এসএসসি পরীক্ষার্থী। ইচ্ছা হচ্ছিল বলি, সম্প্রতি আমাদের প্রধানমন্ত্রী বিবাহের বয়স নিয়ে কী বলেছেন তা তিনি শুনেছেন কিনা। বললাম না। হুমায়ূন আহমেদের বর্ণনাকৃত এমন হাসি দিলাম যাতে হ্যাঁ এবং না দুটিই বোঝা যায়। ‘কনফিউজিং’ হাসি আর কী! তবে ভদ্রলোকের বলা খবরের কাগজটির নাম তিনি বলার আগে আর শুনিনি। ‘কনফিউজিং’ হাসির সঙ্গে নিজেও কাগজটির নাম নিয়ে কনফিউজড ছিলাম।

যাদের আদর্শ মেনে আমার এই মাধ্যমে আসা তাদের মধ্যে একজন ইত্তেফাকে কলাম লিখতেন, লিখতেন আজাদে। পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশের আশির দশক পর্যন্ত তিনি ছিলেন উল্লেখযোগ্য হাতেগোনা কয়েকজন কলামিস্টের একজন। তার সম্পর্কে অন্যরা বলতেন, তার এবং আবুল মনসুর আহমদের লেখায় নাকি তৎকালীন সময়ে পাকিস্তানের কৃষিমন্ত্রীর পদত্যাগ করতে হয়েছিল। এ রকম আরও অনেক উদাহরণ মুগ্ধ হয়ে শুনতাম। চিন্তা করতাম কলমের কী শক্তি। এর সামনে ক্ষমতার প্রাবল্যও নস্যি। এখন শুনতে হয় ‘সাহিত্য’ লিখি! কী আর করা, দিন বদলেছে!

দিন বদলের ‘সিমে’র মতো সত্যিই দিন বদলেছে। বদলের প্রাবল্যে আমরা ক্রমেই ‘আরবান’ জীবনে অভ্যস্ত হচ্ছি। অন্যকথায় আত্মকেন্দ্রিক মানুষ, তথা ‘অরফানে’ পরিণত হচ্ছি। আমাদের পড়ার ইচ্ছা, বোঝার ইচ্ছা, জানার উৎসুকতা ক্রমেই কমে আসছে। কসমোপলিটান যুগে সময় মানেই টাকা। পড়া, জানা, বোঝা এই তিন মানেই সময় নষ্ট, অপচয়। এখন দৌড়ের সময়। সবাই দৌড়াচ্ছেন, আছেন দৌড়ের উপরে। জানা, বোঝার প্রয়োজন নেই, এখন প্রয়োজন শুধু একটি সার্টিফিকেটের, যাতে একটি কাজ মেলে। এর বাইরে পড়ার দরকার নেই, জানার দরকার নেই, বোঝা তো দূরস্থ।

আর রাজনীতি কিংবা ব্যবসায় তো সার্টিফিকেটেরও বাধ্যবাধকতা নেই। সুতরাং পড়ার কী দরকার। আর খবরের কাগজ কিংবা অনলাইন গণমাধ্যম, পড়তে হলে শুধু খবরটা পড়া। তাও পুরো খবর নয়, শুধু শিরোনাম! ‘নিউজ বাহাইন্ড নিউজে’র কী দরকার। সময় নষ্ট করার সময় কই। সবচেয়ে ভালো ফেসবুক! এখানেও তো অনেক খবর (?) পাওয়া যায়। প্রয়োজন কী যাচাইয়ের, সত্য-মিথ্যা ঘাটতে গেলেই সময় নষ্ট, আর সময় নষ্ট মানেই তো ‘লক্ষ্মী’র কৃপা বঞ্চিত হওয়া। বলুন তো, এমন সময়ে কেউ কী ‘লক্ষ্মী’র কৃপা বঞ্চিত হতে চায়! কী আচানক কথা!

‘বিদ্যা লাভে লোকসান, নাই অর্থ নাই মান’। ‘হীরক রাজার দেশে’ ছবিটি যারা দেখেছেন, তারা এ পঙক্তিটির সঙ্গে পরিচিত। সুতরাং যেখানে অর্থ নাই মান নাই, সেখানে সময় নষ্ট করে লাভ কী?

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট

সম্পাদনা: আশিক রহমান