শুক্রবার ২০ জানুয়ারী ২০১৭


আইনকে তুচ্ছ জ্ঞানে ক্ষমতাধররা যা করেন


আমাদের অর্থনীতি :
12.01.2017

 

ইকতেদার আহমেদ

লেখক: সাবেক জজ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

আমাদের মূলদ- আইন দ-বিধি অনুযায়ী একজন অপরাধীকে প্রমাণ সাপেক্ষে আদালত ৫ ধরনের সাজা প্রদান করতে পারে। এ সাজাগুলো হলোÑ মৃতুদ-, যাবজ্জীবন কারাদ-, সশ্রম কারাদ- অথবা বিনাশ্রম কারাদ-, সম্পত্তির বাজেয়াপ্তি এবং অর্থদ-। দ-বিধি প্রণয়নকালে আরও দুই ধরনের সাজা আদালত কর্তৃক প্রদেয় সাজার অন্তর্ভুক্ত ছিল। এ দুই ধরনের সাজা হলো দ্বীপান্তর বা নির্জন বাস ও বেত্রাঘাত। পরবর্তীতে এ দুই ধরনের সাজা আদালতকর্তৃক প্রদেয় সাজা হতে রহিত করা হয়।

আমাদের ফৌজদারি বা দায়রা মামলা বিচারকের ক্ষেত্রে যে পদ্ধতি অনুসৃত হয় এটিকে বলা হয় প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক বিচারব্যবস্থা (অফাবৎংধৎরধষ ঃৎধরষ ংুংঃবস)। আমাদের ফৌজদারি বিচারব্যবস্থা যে মৌলনীতির উপর প্রতিষ্ঠিত এটিকে বলা হয় নির্দোষতার প্রগলভতা (চৎবংঁসঢ়ঃরড়হ ড়ভ রহহড়পবহপব)। এ মৌলনীতিটির অর্থ যথক্ষণ পর্যন্ত আদালতের সম্মুখে উপস্থাপিত সাক্ষ্য দ্বারা একজন অপরাধীর অপরাধ প্রমাণিত না হবে ততক্ষণ পর্যন্ত আদালত ধরে নিবে ব্যক্তিটি নিরপরাধ। পাশ্চাত্যে এবং পৃথিবীর উন্নত রাষ্ট্রসমূহে ফৌজদারি মামলা বিচারের ক্ষেত্রে যে পদ্ধতিটি অনুসৃত হয় সেটিকে বলা হয় অনুসন্ধানমূলকত বিচারব্যবস্থা (ওহয়ঁরংরঃড়ৎরধষ ঃৎধরষ ংুংঃবস)। প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক ও অনুসন্ধানমূলক বিচারব্যবস্থার মধ্যে পার্থক্য হলো প্রথমোক্তটির ক্ষেত্রে প্রমাণের ভার রাষ্ট্রের উপর বর্তায় অপরদিকে শেষোক্তটির নির্দোষতার ভার অপরাধীর উপর বর্তায়।

পাশ্চাত্যে এবং পৃথিবীর উন্নত রাষ্ট্রসমূহে বিচার চলাকালীন আদালতের সম্মুখে উপস্থিত অপরাধীগণ রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের আইনজীবীদের উপবেশনের জন্য যে মানের চেয়ার থাকে তারাও একই মানের চেয়ারে উপবেশন করেন। মামলার সাক্ষীরাও একই ধরনের চেয়ারে উপবেশন করেন।

আমাদের সংবিধান যেটি অপর সকল আইনের উপর প্রাধান্য পায় তাতে স্পষ্টত উল্লেখ রয়েছে যে, কোনো ব্যক্তিকে যন্ত্রণা দেওয়া যাবে না কিংবা নিষ্ঠুর, অমানুষিক বা লাঞ্ছনাকর দ- দেওয়া যাবে না কিংবা কারও সঙ্গে অনুরূপ ব্যবহার করা যাবে না। জাতিসংঘ সার্বজনীন মানবাধিকার দলিল, ১৯৪৮ এর মধ্যেও এ বিধানটি রয়েছে। আমাদের দেশে বিচার চলাকালীন অপরাধীদের যেভাবে আদালতের সামনে করজোড়ে দ-ায়মান করে রাখা হয় সেটি কোনো আইন ও সংবিধান দ্বারা অনুমোদিত নয় বরং সংবিধানে বলা হয়েছেÑ কোনো ব্যক্তিকে যন্ত্রণা দেওয়া যাবে না বা তাকে এমন কোনো দ- দেওয়া যাবে না যা নিষ্ঠুর, অমানুষিক বা লাঞ্ছনাকর অথবা কোনো ব্যক্তির সঙ্গে এমন কোনো ব্যবহার করা যাবে না যা নিষ্ঠুর, অমানুষিক বা লাঞ্ছনাকর।

আমাদের উচ্চাদালতের বিচারকরা শপথের অধীন। শপথ গ্রহণ করাকালীন উচ্চাদালতে একজন বিচারককে অন্যান্য বিষয়ের পাশাপাশি বলতে হয়Ñ তিনি বাংলাদেশের সংবিধান ও আইনের রক্ষণ, সমর্থন ও নিরাপত্তা বিধান করবেন। উচ্চাদালতের একজন বিচারক পদে বহাল থাকাকালীন শপথের অধীন থাকেন। উচ্চাদালতের একজন বিচারকের ক্ষমতা যত ব্যাপকই হোক না কেন তিনি ক্ষমতা প্রয়োগের মাধ্যমে এমন কিছু করতে পারেন না যা সংবিধান এবং আইন দ্বারা অনুমোদিত নয়। আমাদের দেশে বিএনপি ও আওয়ামী লীগ উভয় সরকারের শাসনামলে দেখা গেছেÑ সরকারি দলের আশীর্বাদপুষ্ট হওয়ার কারণে দু-একজন বিচারক সংবিধান ও আইনকে তুচ্ছ গণ্যে আদালত অবমাননার কারণ দর্শানোর নোটিশ জারিপূর্বক আদালতে উপস্থিত হওয়া পরবর্তী ঘণ্টার পর ঘণ্টা অমানুষিক ও অবমাননাকরভাবে আদালতের সম্মুখে দ-ায়মান করে রেখেছেন। আবার দু-একজনের ক্ষেত্রে এমনও দেখা গেছে, আদালত বহির্ভূত স্থানে সড়ক দিয়ে চলাচলের সময় ট্রাফিক সিগন্যালে বিলম্ব করানোর অভিযোগে জনসম্মুখে ট্রাফিক পুলিশকে কান ধরে উঠ-বস করতে বাধ্য করেছেন। উচ্চাদালতের একজন বিচারকের আদালতের অভ্যন্তরে এবং আদালত বহির্ভূত স্থানে এহেন কার্য সংবিধান ও আইনের পরিপন্থি। একজন বিচারকের পক্ষে সংবিধান পরিপন্থি যেকোনো কাজ অভিসংশনযোগ্য।

সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে ৭(ক) অনুচ্ছেদ সন্নিবেশন করত অন্যান্য বিষয়ের পাশাপাশি বলা হয়Ñ কোনো ব্যক্তি শক্তি প্রদর্শন বা শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে বা অন্যকোনো অসাংবিধানিক পন্থায় এ সংবিধান বা এর কোনো বিধানের প্রতি নাগরিকের আস্থা, বিশ্বাস বা প্রত্যয় পরাহত করলে কিংবা তা করবার জন্য উদ্যোগ গ্রহণ বা ষড়যন্ত্র করলে তার এ কার্য রাষ্ট্রদ্রোহীতা হবে। এ অনুচ্ছেদে আরও বলা হয়েছেÑ এরূপ রাষ্ট্রদ্রোহীতার সাজা হবে প্রচলিত আইনে অন্যান্য অপরাধের জন্য নির্ধারিত দ-ের মধ্যে সর্বোচ্চ দ-।

দ-বিধিতে আদালত কর্তৃক যে সকল সাজা প্রদানের কথা বলা হয়েছে তা একমাত্র বিচারকার্য সমাপনান্তে অথবা অপরাধী দোষ স্বীকার করলে দোষ স্বীকার পরবর্তী দেওয়া যায়।

সংবিধান ও দ-বিধির বিধানাবলি হতে স্পষ্ট নিষ্ঠুর, অমানুষিক বা লাঞ্ছনাকর দ- যেমন দেওয়া যাবে না ঠিক এর পাশাপাশি কারও সঙ্গে অনুরূপ ব্যবহারও করা যাবে না। বিগত দুটি সরকারের আমলে যে দু-একজন বিচারক সংবিধান ও দ-বিধিকে উপেক্ষা ও অবজ্ঞাপূর্বক তথাকথিত আদালত অবমাননা সংশ্লেষে দেশের সম্মানিত নাগরিকের আদালত কক্ষে দাঁড় করিয়ে রেখে এবং আদালত বহির্ভূত স্থানে জনসম্মুখে ট্রাফিক পুলিশের প্রতি নিষ্ঠুর, অমানুষিক ও লাঞ্ছনাকর আচরণ করেছেন তা সংবিধানের ৭(ক) অনুচ্ছেদে বর্ণিত বিধানকে আকৃষ্ট করে। সংবিধানে ৭(ক) অনুচ্ছেদে বর্ণিত কর্ম অপরাধ হিসেবে গণ্য হওয়ায় তা কোনো সময় দ্বারা বারিত নয়। বাংলাদেশে এমন অনেক ঘৃণ্য ও জঘন্য অপরাধ সংগঠিত হয়েছে যার বিচার সময় ও পরিস্থিতির প্রতিকূল থাকার কারণে অপরাধ সংগঠন পরবর্তী করা সম্ভব হয়নি। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়Ñ সপরিবারে বঙ্গবন্ধু হত্যা ও জেলখানায় চার জাতীয় নেতা হত্যা। উভয় সরকারের আমলে এ দু-একজন বিচারক সরকারের ও কতিপয় রাজনীতিক ব্যক্তির আশীর্বাদপুষ্ট হওয়ার কারণে তাদের আইনের আওতায় এনে বিচারের ব্যবস্থা করা যায়নি; তবে অপরাধী যত শক্তিধরই হোক অন্যায়ের সাজা তাকে ইহকাল বা পরকালে পেতেই হয়। আমরা অপরাধীর ইহকালে সাজার ব্যবস্থা না করতে পারলে দেশবাসী ও ইতিহাসের কাছে আমাদের দায় থেকে যাবে। আর তাই যারা সংবিধান ও আইনকে তুচ্ছ জ্ঞানে মানুষকে অহেতুক অপমানিত ও লাঞ্ছিত করেছেন তাদের উপযুক্ত সাজার ব্যবস্থা করতে না পারলে ইতিহাস আমাদের ক্ষমা করবে না।

সম্পাদনা: আশিক রহমান