মঙ্গলবার ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৭


বঙ্গবন্ধু ফিরেছ কী ফিরো নাই বুঝিব কেমনে?


আমাদের অর্থনীতি :
12.01.2017

অজয় দাশগুপ্ত

বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের দিনটি আমার স্পষ্ট মনে আছে। আমরা সেদিন শরণার্থী জীবন ঘুচিয়ে দেশে ফেরার পথে বিমানে আগরতলা যাচ্ছিলাম। বিজয়ের পরও বাবার এককথা শেখ মুজিবুর না আসলে যাব কীভাবে? বাঙালির আনন্দ-বেদনা আর স্বস্তির একমাত্র অবলম্বন জনকের জায়গাটা মানুষের মনে ছিল এমনই। তাজউদ্দীন-সৈয়দ নজরুলকে বাদ দিলে বাকিদের বেলায় সাধারণ মানুষের ভরসা ততটা পাকাপোক্ত ছিল না। বঙ্গবন্ধু ফিরে না আসা অবধি বাংলাদেশের অস্তিত্ব আর টিকে থাকার ব্যাপারে সংশয় যায়নি আমাদের। অতঃপর তিনি ফিরেছিলেন এবং নিজে কেঁদে সারাদেশের মানুষকেও কাঁদিয়েছিলেন। তখনকার সঙ্গে এখনকার রাজনীতির এটাই তফাৎ। তখন মানুষ নেতাদের জন্য কাঁদত। অনশন করত। উপোস থাকত। জানবাজি রাখত। আর এখন? মানুষ নেতাদের কথায় হাসে। মজা পায় এবং বিশ্বাস করে না। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে এদেশের রাজনীতিতে যত ছলচাতুরী আর তাকে যতভাবে অপসারণের চেষ্টা হয়েছে তা এখনকার কারও বেলায় হলে দল তো দল কারও টিকিটিরও দেখা মিলত না। কিন্তু তিনি আছেন এবং চিরকাল এভাবেই থাকবেন।

প্রশ্ন হচ্ছে, তার গড়া স্বপ্নের দলকে নিয়ে। আওয়ামী লীগ বিশাল সমাবেশ করে বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস পালন করল বটে কিন্তু কোন স্বদেশের মাটিতে? যেখানে আজ মানুষের আয় রোজগারে ভালো থাকলেও তার মগজ ভালো নেই। তার মেধা ও মনন আছে চরম বিপদে। এইদেশ শুধু আর্থিকভাবে ভালো থাকার জন্য জন্মায়নি। আপনি যদি ইতিহাসের দিকে তাকান বা অতীতে ফিরে যান দেখবেন, অর্থনীতির পাশাপাশি সংস্কৃতি আর বাঙালি হয়ে বাঁচার কারণেই আমরা মুক্তিযুদ্ধ করেছিলাম। নদীগুলোকে তখন আমরা মা মনে করতাম বলে সেøাগান দিতাম, তোমার আমার ঠিকানা পদ্মা মেঘনা যমুনা। আমাদের দেশ, আমাদের জননী বলেই আমরা গাইতামÑ দেশের মাটি তোমার পরে ঠেকাই মাথা। নজরুলের উপর থেকে কাফের আর বিধর্মীর আবরণ সরানোর জন্য আমরা একটি স্বতন্ত্র আবাসভূমি চেয়েছিলাম। আমাদের ধারণা ও স্বপ্ন ছিল এদেশে মানুষের পরিচয় হবে তার নৃ-তাত্বিক জাতিসত্তার ভিত্তিতে। বঙ্গবন্ধু একবার কমনওয়েলথের সম্মেলনে আফ্রিকার এক রাষ্ট্রপ্রধানের কথার উত্তরে সাফ জবাব দিয়ে জানিয়েছিলেন, ধর্মের ভিত্তিতে রাষ্ট্র হলে পুরো আরব এক দেশ হতে পারত। সেটা তো হয়নি। খ্রিস্টানরা ইউরোপে বহুদেশে বসবাস করত না। যার মানে এই দেশ ও জাতির পরিচয়ের সূত্র আরও অনেক কিছু। আমাদের এই নেতা কথায় কথায় রবীন্দ্রনাথ আওড়াতেন। ১০ জানুয়ারির সভায় তিনি গর্ব করে বলেছিলেন, কবিগুরু দেখে যাও তোমার বাঙালি আজ মানুষ হয়েছে।

কিন্তু এখন আমরা কী দেখছি? তার সেই মানুষেরা ধীরে ধীরে সাতচল্লিশ আগের রাজনীতিতে ফিরে যাচ্ছে। এবার তো এমন হাল শিশুরাও ছাড় পাচ্ছে না। চারদিকে এক জগাখিচুড়ি পরিবেশ। আওয়ামী লীগে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে বাদ দিলে বাকিরা যে আসলে কি চায় বা কি তাদের কমিটমেন্ট বোঝা খুব মুশকিল। জনক যে দল রেখে গিয়েছিলেন সে দল তার রক্তের উপরও দাঁড়ানোর শক্তি রেখেছিল। যা চার নেতাকে খুন করা হলো তাদের আদর্শ ও ভালোবাসায় পরের সারির নেতারা মাঠে ময়দানে আবার দল গড়ে তুলতে পেরেছিল। এখন কি সে বাস্তবতা আছে? চারদিকে হয় লোভ নয়তো প্রলোভনের হাতছানি। সুবিধাবাদী আর গদিলোভীদের নিয়ে আওয়ামী লীগ আসলে কি করবে? তার ইতিহাস ও অতীতে যে সংগ্রাম বা তার জন্মের যে কাহিনী তা তো বিএনপির মতো নয়। সিংহাসনে আসীন হয়ে টাকা ছিটিয়ে বা জনগণের অন্ধত্ব ও সাম্প্রদায়িকতাকে পুঁজি করে দল করা এক বিষয় আর মাঠ থেকে তৃণমূল থেকে উঠে আসা বিপরীত বিষয়। আজকের আওয়ামী লীগ ধ্যানে-জ্ঞানে যে বিএনপির বিরোধিতা করে অজান্তে সে তার চেহারা ধারণ করছে না তো?

সবচেয়ে বড় কথাÑ পাঠ্যবই থেকে রাস্তায় নারীদের উপর যে অনাচার দেশজুড়ে মূল্যবোধ ও ভালোবাসার যে অধঃপতন মানুষের মনে ধর্ম-অধর্ম আর সংস্কার নিয়ে যে ব্যবসা দিলজুড়ে পাকিস্তান আচরণে যে ভারতপ্রীতি তার সঙ্গে কি বঙ্গবন্ধুর আদর্শ যায়? তিনি কি এমন স্বদেশে ফিরতে চেয়েছিলেন? তাই স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবসকে মূল্যায়ন করতে হলে আওয়ামী লীগকে তার মূল জায়গায় ফিরতে হবে। সংগ্রামী দলের আওতা পেরিয়ে বহুদূর চলে আসা জনগণের দলটি কি সে কাজ করবে আদৌ?

লেখক: সিডনি প্রবাসী, কলামিস্ট ও বিশ্ববিদ্যালয় পরীক্ষক

সম্পাদনা: আশিক রহমান