মঙ্গল্বার ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০১৭


পদ্মা সেতু ছড়াক রাজনীতির শুভ্র আলো


আমাদের অর্থনীতি :
15.02.2017

প্রতীক ইজাজ
পদ্মা সেতু প্রকল্পে বিশ্বব্যাংকের তোলা দুর্নীতির অভিযোগ থেকে দায়মুক্তি পেয়েছে বাংলাদেশ। খারিজ হয়েছে কানাডার একটি আদালতে এ সংক্রান্ত মামলায় তোলা অভিযোগ। এটি অবশ্যই দেশের জন্য একটি বড় সুখবর, মর্যাদারও বটে। বিশেষ করে সবচেয়ে বড় স্বস্তি সরকারের জন্য। কারণ এ দেশে রাজনীতির ঘেরাটোপ যেমন আছে, তেমনি রাজনীতির খেলায় হারতে নারাজ কোনো দলই। ফলে বহুল আলোচিত পদ্মা সেতুর দুর্নীতির দায় থেকে রক্ষা পাওয়ায় রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের জন্য অনেক বড় পাওয়া। কিন্তু আমার প্রশ্ন অন্য জায়গায়। পদ্মা সেতু প্রকল্পে যে দুর্নীতি হয়নি, উত্থাপিত অভিযোগ যে সর্বৈব মিথ্যা, গত পাঁচ বছরেও এ দেশের রাজনীতি ও রাজনৈতিক দলগুলো প্রমাণ করতে পারেনি। অভ্যন্তরীণ কোনো উদ্যোগও নিতে দেখা যায়নি। না ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ, না সংসদের বাইরের বিএনপিÑ কলঙ্কমোচনে এগিয়ে আসেনি কেউ-ই। সমালোচনা ব্যতিরেকে সংকট সমাধানে কোনোই ভূমিকা ছিল না সুশীল সমাজেরও। রাজনৈতিক ঐকমত্য না হয় হবে না, কিংবা সুদূর পরাহত; কিন্তু পদ্মা সেতুর মতো জাতীয় ইস্যুতে দেশের ভাবমূর্তি রক্ষায় অন্তত রাজনৈতিক দলগুলো পারত সম্মিলিতভাবে এ অভিযোগ ভুল প্রমাণে ঐক্যবদ্ধ প্লাটফর্মে দাঁড়াতে, সম্মিলিত উদ্যোগ নিতে। কেউ কোনো উদ্যোগ নেয়নি। বরং চিরাচরিত পথেই হেঁটেছে রাজনীতি, চলেছে রাজনীতির নোংরা খেলা। পদ্মা সেতুকে বৃত্ত ধরে কেবলই ঘুর্ণায়িত হয়েছে রাজনীতির কূটকৌশল, বিরোধী শিবিরকে কোণঠাসা করে রাখতে প্রয়োগ হয়েছে অপরাজনীতির নানাবিধ জটিল সূত্র। আর সংকট সমাধানে, নিজেদের শুদ্ধতা প্রমাণে, আমরা তাকিয়ে ছিলাম ভিন দেশের এক আদালতের দিকে।
তারা বললেন, আমরা খুশি হলাম। তারা সনদ দিলেন, আমরা সম্মিলত কণ্ঠে কথা বলে উঠলাম। এখন জাতীয় সংসদ থেকে শুরু করে পথ-ঘাট, চায়ের দোকান, অলিগলি, সবখানে সাধুবাদ, নিজেদের কীর্তন। এমনকি বিশ্বব্যাংক ও পেছনের ষড়যন্ত্রকারীদের বিরুদ্ধে মামলা ও প্রধানমন্ত্রীর কাছে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়ারও দাবি উঠেছে জোরালভাবে। কিন্তু নিজেদের অন্ধকার রাজনীতিতে আলো জ্বালানোর প্রয়োজন অনুভব করছি না। করলাম না। একবারও কেউ বললাম না। বলছি না, সংকট সমাধানের পথ নিজেদেরই বের করতে হবে, শুভশক্তির সংস্কৃতি চালু করতে হবে, অন্ধগলির রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে আমাদের। এর ফলে কি হলোÑ একদিকে নিজেদের সুকীর্তি নিজেরা প্রমাণে ব্যর্থ হলাম অসংঘবদ্ধতার কারণে; তেমনি মাঝখানে দীর্ঘ পাঁচটি বছর জাতি হিসেবে ভীষণ অপদস্থ হতে হলো আমাদের। দুর্নাম কুড়াতে হলো। দুর্ভোগ পোহালাম সাধারণ মানুষ। বিশেষ করে এই দরিদ্র দেশে আর্থিক ক্ষতির বোঁঝাটা ভীষণ ভারি ঠেকছে আমাদের কাছে।
দুর্নীতির অভিযোগ ওঠায় সেতুর কাজ অনেক পিছিয়ে গেছে। বেড়েছে নির্মাণ ব্যয়। ২০১৫ সালেই শেষ হতো সেতুর কাজ। আর জিডিপিও বাড়ত ১ দশমিক ২ শতাংশ। যাক, তবুও দুর্নীতির দায় থেকে রক্ষা মিলেছে আমাদের। কিন্তু উদ্বেগটা অন্য জায়গায়। আইনমন্ত্রী এখন বলছেন, পদ্মা সেতু ষড়যন্ত্রের অনেক তথ্যপ্রমাণ তার কাছে রয়েছে। কিন্তু তিনি এতদিন কিছু বলেননি। গণমাধ্যমে স্পষ্ট করে কিছু বলেননি অভিযুক্ত তৎকালীন যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনও। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ রাজনৈতিকভাবে বক্তব্য বিবৃতি দিলেও জনমত গড়ে তোলেননি এই অভিযোগ মিথ্যে প্রমাণে। তার মানে এতদিন পদ্মা সেতুতে দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে আমরা খেলেছি, অন্যপক্ষকে ঘায়েল করার চেষ্টা করেছি, সংকট সমাধান চাইনি। তার মানে কি আমরা এখনো রাজনীতির আঁধারে; নাকি ইচ্ছে করেই অন্ধকার রাজনীতি জিইয়ে রাখতে চাইছি? জানি এ প্রশ্নের সমাধান রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষে দেওয়া সম্ভব নয়, দেবে না। তবে অন্ততপক্ষে শুদ্ধ, সুন্দর রাজনীতির সংস্কৃতি চর্চা তো চালু করতে পারে, না হয় সেটি-ই করুক। রাজনীতির এই দেশে ক্ষমতার রাজনীতি এত প্রবল ও পরাক্রমশালী হয়ে উঠেছে যে, আমরা আর শ্বাস নিতে পারছি না!
লেখক: সাংবাদিক, কবি, সংস্কৃতিকর্মী
সম্পাদনা: আশিক রহমান