শনিবার ১৮ নভেম্বর ২০১৭


কর্নাটকের বেঙ্গালুরু জেলে শশীকলা


আমাদের অর্থনীতি :
16.02.2017

ইমরুল শাহেদ: ভারতের সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অনুসারে কর্নাটক রাজ্যের রাজধানী বেঙ্গালুরুতে আত্মসমর্পণ করলেন শশীকলা। তিনি নিজেই গাড়ি ড্রাইভ করে বুধবার বিকেলে জেলখানায় পৌঁছে যান বলে এনডিটিভি জানিয়েছে। রাস্তার সিগনালে দাঁড়ানো শশীকলাকে বিপুল সংখ্যক সমর্থক হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানান। এ সময় ৬১ বছর বয়সী শশীর পরণে ছিল বাদামী রংয়ের শাড়ি। তিনি সকালেই চেন্নাই থেকে যাত্রা করেন। যাত্রা পথে তিনি জয়ললিতার সমাধিতে যান এবং সেখানে কিছু সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। সে সিদ্ধান্ত কী তা জানতে দেওয়া হয়নি কাউকে। দুর্নীতির অভিযোগে তাকে দিল্লি সুপ্রিম কোর্ট ৪ বছরের জেল, ১০ কোটি রুপি জরিমানা ও ১০ বছর নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে না পারার রায় দিয়েছে।

বেঙ্গালুরুতে যাত্রার আগের দিন বিকেলে চেন্নাইয়ের একটি রিসর্টে তিনি ১২০ জন বিধায়কের উদ্দেশে বক্তৃতা করেন। ছয়দিন আগে এই রিসর্টটিতে সমবেত বিধায়কদের উপস্থিতিতে রিসর্টটি অনেকটা দলীয় কার্যালয়ের রূপ নিয়েছে। তিনি বলেছেন, ‘তারা আমাকে কারাগারে নিতে পারে। কিন্তু আপনাদের প্রতি আমার ভালোবাসাকে কারাগারে নিতে পারবে না।’ তিনি বলেন, ‘আমি যেখানেই থাকি না কেন, আমি দলের সঙ্গেই আছি।’ ভারতের আজকালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১১ সালে শশীকলা, তার স্বামী এম নটরাজন, বৌদি, ভাইপোসহ বেশ কয়েক জন আত্মীয়কে পয়েস গার্ডেনের বাড়ি থেকে বার করে দিয়েছিলেন জয়ললিতা। তাদেরকে এআইএডিএমকে দল থেকেও বহিষ্কার করেন। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয়, জয়ললিতার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছিলেন তারা। পরে শশীকে ফিরিয়ে আনা হলেও বাকিদের পয়েস গার্ডেনের কাছে ঘেঁষতে দেওয়া হয়নি। শশীকে বাকিদের সঙ্গে সম্পর্ক রাখা যাবে না বলেও শর্ত দেওয়া হয়। জয়ললিতার মৃত্যুর পর জানা যায়, শশী ও তার স্বামীর মধ্যে সম্পর্ক বজায় ছিল। জয়ললিতার মৃত্যুর পরে দলের ভার নিজের হাতে নেন শশী। এবার সুপ্রিম কোর্টের রায়ে জেলে যাওয়ার আগে দলের দায়িত্ব নিজের পরিবারকে এগিয়ে দিলেন। বুধবার নিজের দুই ভাইপো টিটিভি দিনকরণ এবং ভেঙ্কটেশকে দলে ফিরিয়ে আনলেন। দিনকরণকে দলের সহকারী সাধারণ সম্পাদক পদেও নিয়োগ করেন। এই নিয়ে তার স্বামী নটরাজনের বক্তব্য, দিনকরণ, ভেঙ্কটেশকে ফেরানোর সিদ্ধান্ত দলের। তবে তিনি শশীর পাশেই থাকবেন। শশী বিরোধীদের ক্ষোভ, বহিষ্কৃতদের দলে ফিরিয়ে ‘আম্মা’র সঙ্গেই বিশ্বাসঘাতকতা করা হলো। শশী শিবির অবশ্য এসব মানছেন না। কিন্তু পয়েস গার্ডেনের বাড়িতে জয়ললিতার অজান্তে ষড়যন্ত্র হয়েছে, মানতে চায়নি সুপ্রিম কোর্ট। মঙ্গলবার শশীকলাকে আয়বহির্ভূত সম্পত্তি মামলায় দোষী সাব্যস্ত করার সময় সুপ্রিম কোর্ট জানিয়ে দিল, ৬০ কোটিরও বেশি টাকা নয়-ছয়ের শিকড় রয়েছে জয়ললিতার পয়েস গার্ডেনের বাড়িতেই। সেখানে বসেই সমস্ত ষড়যন্ত্র হয়েছিল। শশীর পাশাপাশি তার বৌদি ইলাভারাসি এবং জয়ার পালিত পুত্র সুধাকরণকেও দোষী সাব্যস্ত করেছে সুপ্রিম কোর্ট।

বিচারপতি পিনাকীচন্দ্র ঘোষ এবং বিচারপতি অমিতাভ রায় মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১০টায় যখন সুপ্রিম কোর্টের ভিড়ে ঠাসা ছয় নম্বর এজলাসে ঢুকলেন, তখন ঘরে ছিল পিন পতন নীরবতা। ৫৭০ পৃষ্ঠার রায়ের আসল অংশটা পড়তে সময় লেগেছে আট মিনিট। এই দুই বিচারপতির বেঞ্চ বলেছে, আয়বহির্ভূত রোজগার দিয়ে ভুয়া সংস্থার নামে বেশকিছু সম্পত্তি কেনা হয়েছিল। এই ভুয়া সংস্থাগুলো পয়েস গার্ডেনের বাড়িতে বসেই পরিচালন করা হতো। জয়ললিতা এ বিষয়ে কিছুই জানতেন না বিশ্বাস করা অসম্ভব। আরও একটি বিষয়ের ওপর জোর দিয়েছে আদালত। জানিয়েছে, ‘৪ অভিযুক্ত একই বাড়িতে থাকতেন। তাই তাদের মধ্যে ষড়যন্ত্রের যোগসূত্র থাকা অস্বাভাবিক নয়। তাছাড়া শশী, তার বৌদি এবং সুধাকরণ কারও সঙ্গেই জয়ার রক্তের সম্পর্ক নেই। ষড়যন্ত্রের জন্যই তাদের ওই বাড়িতে ঠাঁই দেওয়া হয়েছিল।’ তদন্তে দেখা গেছে, জয়ার অ্যাকাউন্ট থেকে ক্রমাগত বাকি তিন অভিযুক্ত এবং ভুয়া সংস্থার অ্যাকাউন্টে টাকা লেনদেন হয়েছে। এবং সবটাই হয়েছে পয়েস গার্ডেনে বসে। আদালত তাই এই সব অ্যাকাউন্টকে আলাদা নয়, বরং একজনের অ্যাকাউন্ট হিসেবেই দেখছে। সেই ব্যক্তি যে জয়ললিতা, তা স্পষ্ট। একই কারণে টাকা নয়ছয়ের পিছনেও তাই চার অভিযুক্তের সমান ভূমিকা রয়েছে বলেই রায় বেঞ্চের।

আনন্দবাজারের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জয়ার প্রথম দফার শাসনকালে দুর্নীতির অভিযোগ আনেন সুব্রহ্মণ্যম স্বামী। আয়ের সঙ্গে সঙ্গতিহীন সম্পত্তি মামলায় বেঙ্গালুরুর বিশেষ আদালত জয়া, শশীকলা ও অন্য দুজনকে দোষী সাব্যস্ত করে চার জনকেই চার বছরের কারাদ- দেয়। বাকিদের জন্য ১০ কোটি রুপি জরিমানা হলেও জয়ার ক্ষেত্রে তার পরিমাণ ছিল ১০০ কোটি। ২০১৪-র সেপ্টেম্বরের ওই রায়ের ধাক্কাতেই মুখ্যমন্ত্রীর গদি ছাড়তে হয় জয়ললিতাকে। কিন্তু ২০১৫-র মে মাসে জয়ললিতা, শশীসহ চার জনকেই বেকসুর খালাস করে কর্নাটক হাইকোর্ট। গদিতে ফেরেন আম্মা।

এই দুর্নীতির মামলাটি নিম্ন আদালত থেকে হাই কোর্ট হয়ে সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত গড়ায়। কিন্তু হাইকোর্টের রায় খারিজ করে নিম্ন আদালতের রায়ই বহাল রেখেছে বিচারপতি ঘোষের বেঞ্চ। রায় বলছে, সমস্ত প্রমাণ অনুযায়ী, জয়ললিতা, শশীকলা ও অন্যরা দুর্নীতির অপরাধে দোষী। চার জনে ষড়যন্ত্র করে বিপুল বে আইনি সম্পত্তি করেছিলেন। পরে জয়ললিতা তা বাকিদের মধ্যে ভাগ করে দেন। যাতে তার নিজের গায়ে আঁচ না লাগে। কিন্তু জয়ললিতার সঙ্গে বাকি তিন অভিযুক্তের ‘অবিচ্ছেদ্য আঁতাত’ প্রমাণিত হয়েছে। জয়ললিতা মারা গিয়েছেন বলে তার বিরুদ্ধে মামলার অস্তিত্ব থাকছে না। কিন্তু বাকিদের দোষী সাব্যস্ত করা ও শাস্তি সম্পর্কে নিম্ন আদালতের রায়ই বহাল থাকছে।