সোমবার ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০১৭


বিশ্বব্যাংকের দুনিয়াজোড়া সেই রাজত্ব আর নেই


আমাদের অর্থনীতি :
18.02.2017

 

ফিরোজ আহমেদ

পররাষ্ট্রনীতি দিয়েই কখনো কখনো দেশের অভ্যন্তরীণ বাস্তবতাও বোঝা যায়। মুক্তিযুদ্ধের পর দেশের মানুষকে হতাশ করে বাংলাদেশ আত্মসমর্পণ করে বিশ্বব্যাংকের কাছে। দেশের অর্থনীতি-সমাজ-সংস্কৃতি-শিক্ষা পুনর্গঠনের কোনো যথাযথ কর্মসূচি না নিয়ে পাকিস্তানি কায়দারই ফিরে ফিরে আসা চলতে থাকে। বিশ্বব্যাংককে খুশি করতে তাজউদ্দীন বিদায় হন।

আশি ও নব্বই দশক ছিল বিশ্বব্যাংকের চূড়ান্ত রমরমা। বন্যা নিয়ন্ত্রণ কেমনে হবে থেকে শুরু করে শিক্ষা কিভাবে বেসরকারি হবে, স্বাস্থ্য কিভাবে চলবেÑ সব কিছুতেই নির্ধারক ছিল তারাই। এরই পরিণামে বাংলাদেশের শিক্ষার বারোটা বেজেছে, বহুগুন বেশি টাকা খরচ করেও সরকারি কি বেসরকারি হাসপাতাল সর্বত্রই মানুষ চিকিৎসা নিয়ে বিপদে আছে। শিক্ষার কথা আর কি বলি! পরিবেশ-প্রকৃতি বিপর্যস্ত হয়েছে। আশি-নব্বই এ বাংলাদেশের যত ক্ষত, তার সঙ্গে বিশ্বব্যাংকের কোনো না কোনো সম্পর্ক আছে। যদিও এই প্রক্রিয়ার শুরু ষাটের দশকেই এবং অবিচ্ছিন্নভাবে। বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ এবং এডিবি এই তিন সংস্থার হাতে বাংলাদেশের নিজস্ব বিকাশ সম্পূর্ণভাবে বিপর্যস্ত হয়েছে, আমাদের নিজস্ব শিল্প সম্ভাবনার বিকাশ বিনষ্ট করে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে অন্যদের প্রয়োজনকে।

বিশ্বব্যাংকের দুনিয়া জোড়া সেই রাজত্ব আর নেই। স্থানীয় ভিত্তিতে বহু মাতব্বর গজিয়েছেন। তারা তাদের রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের জোরে বিশ্বব্যাংকের চেয়েও বেশি হারের সুদে বিশ্বব্যাংকের চেয়েও ভয়াবহ সব প্রকল্প বাস্তবায়ন করাতে পারে। যেমনÑ ভারত থেকে বাংলাদেশ ঋণ নিয়েছে রেলওয়ে বিভাগের জন্য। চীনা রাষ্ট্রপতি বিশাল সব ঋণের উপহার নিয়ে বাংলাদেশ সফর করে গেলেন। লক্ষ্যণীয়, যে দেশগুলো যত কম বিশ্বব্যাংকের মাতব্বরী সহ্য করেছে, তত বড় আকারে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক স্তরে অর্থনৈতিক মাতব্বর হতে পেরেছেন, রাজনৈতিক স্তরেও হয়ে উঠেছেন বা হতে যাচ্ছেন।

কিন্তু যারা বিশ্বব্যাংকের সব উপদেশ মন দিয়ে শুনল তাদের কি হলো? বিশ্বব্যাংকের পড়তিকালে তারা কি মুক্ত হলো? না, তারা বড় সর্দারের হাত গলে পড়ল ছোট সর্দারদের হাতে। বৈশ্বিক লগ্নিপুঁজির হাত গলে গেল পাড়ার সুদখোরের হাতে। ধূর্ত প্রকৌশলীর হাত গলে যেন পড়ল হাতুড়ে কারিগরের হাতে।

চার দশক বিশ্বব্যাংকের বিরুদ্ধে নীরব বুদ্ধিবেচা মোসাহেবরা আজ সরব, কিন্তু ক্রমশ ম্রিয়মান (যদিও এখনো প্রবল) পক্ষকে নিয়ে সব আলোচনার ফাঁকে তারা কি এক্সিম ব্যাংকের সঙ্গে সুন্দরববনের বিনাশের পাদটীকাটা একবার দিয়ে রাখবেন?

বিশ্বব্যাংক চকরিয়ার সুন্দরবনটাকে খেয়েছে, ভারতীয় এক্সিম ব্যাংক যে আস্ত সুন্দরবনটাকে গিলে খাবে, তার বেলা? রূপপুরে রুশ আর চকরিয়ায় চীনারা এই নতুন বহুমাতত্বরের-অধীনস্ততার সময়ের স্মারকমাত্র এবং এদের নির্লজ্জতা, লোভ, জবাবদিহিতাহীনতা আর প্রকৃতির প্রতি নিষ্ঠুরতা অদৃষ্টপূর্ব, বিশ্বব্যাংকের কথা স্মরণে রেখেও তা বলা যায়।

লেখক: কেন্দ্রীয় সদস্য, গণসংহতি আন্দোলন

ফেসবুক থেকে