সোমবার ২১ অগাস্ট ২০১৭


ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদ ও একজন বলবীর শিং!


আমাদের অর্থনীতি :
17.03.2017

 

মুহাম্মদ নাজমুল ইসলাম

ভারতের আলোচিত একটি মসজিদের নাম বাবরী মসজিদ। বাবরি মসজিদ’র অর্থ ‘বাবরের মসজিদ’। ১৫২৭ খৃস্ট. মুঘল সম্রাট ‘বাবর’ এর আদেশে নির্মিত হওয়ার কারণেই এ নামে নামকরণের কারণ। মসজিদটি ভারতের উত্তর প্রদেশের ‘ফৈজাবাদ’ জেলার অযোধ্যা শহরের রামকোট হিলের উপর অবস্থিত। ১৯৯২ খৃস্টা. একটি রাজনৈতিক সমাবেশের উদ্যোক্তারা ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের আদেশ অনুযায়ী মসজিদ ক্ষতিগ্রস্থ হবে না এই প্রতিশ্রুতি দিয়ে মসজিদ সংলগ্ল এলাকায় একটি রাজনৈতিক সমাবেশ শুরু করে। যা দেড় লক্ষ জনসম্মিলিত একটি দাঙ্গার রুপ নেয়। এ দাঙ্গার ফলে মসজিদটি সম্পূর্ণরুপে ভূমিসাৎ করা হয়। ফলস্বরুপ ওই একই বছর ভারতের প্রধান শহরগুলোতে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সংঘটিত দেখা দেয়। ছড়িয়ে পড়া এসব দাঙ্গার কারণে শুধু মুম্বাই ও দিল্লীতেই দুই হাজার মানুষের প্রাণ যায়। দিল্লির সুলতানি

এবং তার উত্তরাধিকারী মুঘল সাম্রাজ্যের শাসকরা শিল্প এবং স্থাপত্যের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। তাঁদের নির্মিত অনেক সমাধি, মসজিদ ও মাদরাসা সূক্ষ নির্মাণকৌশল তার নিদর্শন বহন করে। মসজিদটি সম্রাট আকবর দ্বারা গৃহীত ইন্দো-ইসলামি গঠনশৈলীর প্রতীক ছিলো।

আধুনিক স্থপতিদের মতে বাবরি মসজিদের চিত্তাকর্ষক স্বনবিদ্যার কারণ হল মসজিদটির মিহরাব ও পার্শ্ববর্তী দেয়ালগুলিতে বিভিন্ন খাঁজ। এছাড়াও বাবরি মসজিদ নির্মাণের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত বেলেপাথর অনুনাদের কাজ করে যা মসজিদটির শব্দ নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়ায় সাহায্য করতো। ২০১০ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর এলাহাবাদ হাইকোর্ট বাবরি মসজিদ যে স্থানে ছিল সে ভূমি সম্পর্কিত রায় দেয়। এলাহাবাদ হাইকোর্টের তিনজন বিচারপতির সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ তাদের রায়ে ২.৭৭ বা ১.১২ হেক্টর ভূমি সমান তিনভাগে ভাগ করার রায় প্রদান করেন। যার এক অংশ পায় হিন্দু মহাসভা রাম জন্মভূমিতে রাম মন্দির নির্মাণের জন্য, দ্বিতীয় অংশ পায় ইসলামিক সুন্নি ওয়াকফ বোর্ড এবং বাকি তৃতীয় অংশ পাবে নির্মোহী আখরা নামে একটি হিন্দু সংগঠন।

১৯৯২ সনের ৬ ডিসেম্বর। ৪০ কেজি ওজনের কুঠার হাতে প্রচ- আক্রোশে ক্ষিপ্ত এক রাজপুত যুবক শরিক হয় ৫ লক্ষ উন্মাতাল মানুষের মিছিলে, বাবরি মসজিদ ভাঙার নারকীয় তা-বে। নাম তার বলবীর সিং। প্রথম কোপ দেবার জন্য কুঠার ওপরে তোলার সাথে সাথেই তার বুক ধরফর করা শুরু হলো। বহু কষ্টে প্রথম কোপ দেবার পর, দ্বিতীয় বার কোপ দেবার আর সাহস পেলো না। অনেক কষ্টে দ্বিতীয় কোপ দেবার পর ৩য় কোপ দেবার জন্য যখন কুঠার ওপরে তুলেছে, এবার সে আর কোনভাবেই কুঠার নামাতে পারছে না। এখন সে চোখের সামনে ৩টি মৃত্যুকে দেখতে পাচ্ছে। প্রথমত কুঠারটা কোনভাবে তার মাথায় পড়লে মৃত্যু অবধারিত, দ্বিতীয়ত যে উঁচুতে উঠে সে বাবরি মসজিদ ভাঙ্গছিল সেখান থেকে নিচে পড়ে গেলেও মৃত্যু সুনিশ্চিত, তৃতীয়ত তার হৃদপি- যেভাবে কাঁপছে যে কোন সময় হার্ট অ্যাটাকে সে মার যেতে পারে।

এমতাবস্থায় তার সহযোগী অন্যদের সহযোগিতায় তাকে নামিয়ে আনতে সক্ষম হয়। তার সহযোগী প্রায় মাসখানেকের মাথায় মাওলানা কালিম সিদ্দিকির হাতে ইসলাম গ্রহণ করে এবং ৩ চিল্লায় চলে যায়। তার নতুন নাম হয় মুহাম্মাদ উমার। এদিকে ৩ চিল্লা থেকে ফিরে এসে উমার বলবীরকে খুঁজতে থাকে। বলবীরের অবস্থা এরকম হয় যে সে কিছুতেই শান্তি পাচ্ছিল না। ৬ ডিসেম্বরের পর থেকে প্রায় ৬ মাস তার দিন কেটেছে কখনো গাছের নিচে, কখনো রাস্তায় রাস্তায়। অবশেষ প্রায় ৬ মাসের মাথায় বলবীর সিং মাওলানা কালিম সিদ্দিকির হাতে ইসলাম গ্রহণ করে। তার নতুন নাম হয় মুহাম্মাদ আমির।

এই যে কথাগুলো বললাম, সেগুলো কারো থেকে শুনে বা পড়ে বলছি না, বরং মুহাম্মাদ আমির ওরফে বলবীর সিংয়ের একেবারে নিকটে বসে তার নিজ মুখ থেকে শুনে বললাম। অনেক কথাই তিনি বললেন যেগুলো এখানে বলিনি, আমি শুধু সে অংশটুকুই বললাম যেটা মুহাম্মাদ আমির বলতে চাচ্ছিলেন না, শ্রোতাদের অনুরোধে মসজিদ ভাঙার সেই কাহিনী বলতে গিয়ে তার চোখ ছলছল করছিলো। তিনি খুব আফসোস করে বলছিলেন, মুসলিমরা আমাদের পাশেই ছিল। তারা আতরের ব্যবসা করেছে, তছবির ব্যবসা করেছে, টুপির ব্যবসা করেছে; কিন্তু একবারও কেউ বুঝিয়ে বলে নাই মসজিদ আল্লাহর ঘর, এটা ভাঙা যায় না। কথা এখানেই শেষ নয়, বরং শুরু। যে হাত একদিন মসজিদ ভাঙতে উদ্যত হয়েছিল, সেই হাতে আজ গড়ে উঠছে, আবাদ হচ্ছে মসজিদের পর মসজিদ। দেশভাগের পর মুসলিমদের পরিত্যক্ত মসজিদ যেগুলোকে গোয়ালঘরে রূপান্তরিত করা হয়েছিল, মুহাম্মাদ আমির সেগুলোকে আবার মসজিদ হিসেবে আবাদ করে চলেছেন।

প্রচ- অনুতপ্ত এই মানুষটি এই পর্যন্ত শ’খানেক মসজিদ নির্মাণ করেছেন, আর তার সেই সহযোগি মুহাম্মাদ উমর এ পর্যন্ত ৪৭টি মসজিদ তৈরি করেছেন। মুহাম্মাদ আমির প্রতিবছর তাবলিগে ৪ মাস সময় দেওয়ার পাশাপাশি অমুসলিমদের ওপর দাওয়াতের যে কার্যক্রম চালান তাতে এখন পর্যন্ত ১০,০০০ মানুষ ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় গ্রহণ করেছে। আল্লাহতায়ালা তার মেহনতকে কবুল করুন আমাদেরকেও দ্বীনি কাজে উদ্বুদ্ধ হবার তাওফিক দান করুন।  লেখক : শিক্ষার্থী, দেওবন্দ, ভারত।