বৃহস্পতিবার ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৭


চিকিৎসাসেবায় আস্থার সংকট


আমাদের অর্থনীতি :
20.05.2017

 

ফাহমিদা হক

মানুষ মাত্রই মরণশীল। জন্মের পর থেকে অসুখ-বিসুখের সঙ্গে যুদ্ধ করেই বাঁচতে হয়। আর দিন দিন অসুখ-বিসুখ যত বাড়ছে তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আধুনিক বিজ্ঞানের উন্নতির ফলে মানুষ মৃত্যুকেও জয় করার স্বপ্ন দেখছে। মৃত্যুকে পুরোপুরি জয় না করতে পারলেও মানুষ এটা বিশ্বাস করতে পারে সুচিকিৎসা দিতে বা নিতে পারলে, যেকোনো অসুখ-বিসুখ সেরে উঠবে।

মানি আর নাই মানি, এটাই সত্যি যে, সুচিকিৎসা দেওয়ার মতো যথেষ্ট ডাক্তার, হাসপাতাল বা সেবার মান কোনোটাই যথেষ্ট নেই আমাদের। আবার আমাদের ডায়গনস্টিক সেন্টারগুলোর উপর আস্থা হারানোয় সুচিকিৎসা নেওয়ার ক্ষেত্রে আমাদের লোকজন বিদেশে দৌড়ায়। সেবা হলো পরম ধর্ম, আমাদের হতভাগা দেশে সেবার মানই সবচেয়ে খারাপ। তাই সামান্য অসুখেও এখন নিজের দেশে চিকিৎসা নিতে নারাজ। অধিকাংশ লোকজন মোটামুটি টাকা যোগাড় করতে পারলেই বিদেশে ছুটেন, দিনে দিনে আমাদের সেবার মান কমতে কমতে এখন তা তলানীতে গিয়ে ঠেকেছে। এমন খুব কম মানুষই পাওয়া যাবে, যিনি চিকিৎসা নিতে গিয়ে এখানে হয়রানির শিকার হননি।

ঢাকার বাইরে থেকে রাজধানী ঢাকায় চিকিৎসা নিতে আসা প্রত্যেকটা মানুষকে হাজারটা সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়, প্রথমে প্রচ- ট্রাফিক যন্ত্রণা সহ্য করে ঢাকায় পৌঁছাতে গিয়ে রোগীর সঙ্গে থাকা মানুষও রুগ্ন হয়ে পড়ে, তারপরে ডাক্তারের সিরিয়াল নেওয়া সেটা তো রীতিমতো আরেক যুদ্ধ। ডাক্তার দেবেন একগাদা পরীক্ষা, আর সেগুলো করাতে হবে তার পছন্দনীয় কোনো ডায়গনস্টিক সেন্টারে; তারপর সেই রিপোর্ট আসে আবার ভুল। আর ভুল রির্পোট দিয়ে সঠিক চিকিৎসা অসম্ভব, তা ডাক্তার যতই অভিজ্ঞ আর নামকরা হোক না কেন। তারপরে হাসপাতালের পরিবেশ, ডাক্তার, পরীক্ষা-নিরীক্ষা আর ঔষধের খরচ সব মিলিয়ে মোটামুটি কোনো অসুস্থ মানুষসহ তার পরিবারের বারোটা বেজে যায় আমাদের দেশে চিকিৎসা নিতে যাওয়া প্রত্যেকটা মানুষের।

আমার নিজের ছোট একটা অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে চাই, যাতে আশা করি সবাই বুঝতে পারবে কেন টাকা খরচ করে মানুষ বিদেশে চিকিৎসা করাতে যায়, কেন দেশের চিকিৎসাসেবার উপর আস্থা রাখতে পারে না লোকজন। ২০০৮ সালের কথা, আমার দ্বিতীয় বাচ্চাটা জন্মের পরপর ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়ে। বাংলাদেশের মোটামুটি নামকরা হাসপাতালের নামকরা ডাক্তারদের অধীনেই ছিলাম আমরা, কিন্তু জন্মের পরপর অসুস্থ বাচ্চার রোগ শনাক্ত করতে সময় লেগেছিল ২৫ দিন। আর এরই মধ্যে ভুল পরীক্ষা-নিরীক্ষা আর উল্টা-পাল্টা চিকিৎসা দিয়ে নবজাতক শিশুর অবস্থা যতটা না খারাপ হওয়ার কথা ছিল তার চেয়ে অনেক অসুস্থ হয়ে যায় বাচ্চাটা। যখন সমস্যা ধরা পড়ে তখন সে প্রায় মৃত্যুপথের যাত্রী। কিছুদিন চিকিৎসা শেষে সে অবশ্য মারা যায়। কি ভয়াবহ ছিল হাসপাতালের সেইসব দিনগুলো। এখনো আমি ভয়ে, রাগে, কষ্টে ওই হাসপাতালের প্রতি ঘৃণা দূর করতে পারি না। যদিও ওই হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে হাজারো মানুষ সুস্থ হয়ে ফিরছেন। কিন্তু আমি আমার চারপাশের সবাইকে ওই হাসপাতালে যেতে বারণ করি। আমার বিশ্বাস ওই হাসপাতালে গেলে রোগী ভুল চিকিৎসার কারণে মারা যাবে। আমি জানি এটা আমার আবেগী চিন্তা, কিন্তু এটা তো সত্যি যে, ওরা আমার আস্থা, বিশ্বাসের জায়গাটা নষ্ট করে দিয়েছে চিরতরে। আমি দেখেছি কি ভয়াবহভাবে কষ্ট দেওয়ার, আত্মবিশ্বাস নষ্ট করার জন্য দায়ী আমাদের ডাক্তার, হাসপাতালগুলো।

বিদেশিদের চিকিৎসাসেবার গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য হয়ে উঠেছে ভারত। এক্ষেত্রে সবার উপরে আছে বাংলাদেশ। ভারতের সরকারি উপাত্ত বলছে, দেশটিতে চিকিৎসাসেবা নেওয়া প্রতি তিনজনের একজন বাংলাদেশি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের চিকিৎসাসেবা নিয়ে আমাদের মানুষের আস্থার অভাব রয়েছে। অভিযোগ আছে অতিরিক্ত ব্যয়েরও। অন্যদিকে ভারতের চিকিৎসাব্যবস্থার দ্রুত উন্নতির পাশাপাশি বাংলাদেশিদের জন্য ভিসাপ্রাপ্তিও সহজ করেছে দেশটি। এসব কারণে বাংলাদেশ থেকে ভারতে চিকিৎসা নিতে যাওয়া মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। ভারতের বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন ডিরেক্টরেট জেনারেল অব কমার্শিয়াল ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড স্ট্যাটিস্টিকস (ডিজিসিআইঅ্যান্ডএস) একটি সমীক্ষা চালিয়েছে। সমীক্ষার তথ্যানুযায়ী, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ভারতে চিকিৎসাসেবা গ্রহণকারী বিদেশি নাগরিকদের মধ্যে সংখ্যায় সবচেয়ে বেশি ছিল বাংলাদেশি। অর্থবছরটিতে ভারতে চিকিৎসা নিয়েছে মোট ৪ লাখ ৬০ হাজার জনবিদেশি। এর মধ্যে বাংলাদেশ থেকেই গেছে ১ লাখ ৬৫ হাজার জন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. রশিদ-ই-মাহবুব বলেন, কয়েকটি কারণে বাংলাদেশের মানুষ ভারতে চিকিৎসা নিয়ে থাকে। প্রথমত যোগাযোগব্যবস্থা; উত্তরবঙ্গ থেকে ঢাকায় আসতে যত সময় লাগে, ভারত যেতে তার চেয়ে কম সময় লাগে। তাছাড়া আমাদের কিছু জায়গায় ঘাটতি রয়েছে। দক্ষতার অভাবের পাশাপাশি চিকিৎসকদের ব্যবহারও অনেক ক্ষেত্রে রোগীবান্ধব নয়। রোগীর সঙ্গে যোগাযোগের দক্ষতায় ঘাটতি রয়েছে ডাক্তারদের। এসব কারণেই মূলত বেশি সংখ্যক রোগী ভাল চিকিৎসা নিতে ভারতে চলে যাচ্ছে। তাছাড়া ভারতের তুলনায় রোগীপ্রতি ব্যয়েও বাংলাদেশ রয়েছে উপরে। এছাড়া যেকোনো দূরারোগ্য ব্যাধির চিকিৎসা আধুনিকায়নে আমরা পিছিয়ে। মূলত বাংলাদেশের চিকিৎসাসেবার ওপর আস্থা হারানোয় এ প্রবণতা বাড়ছে। মোটকথা, আমাদের দেশের চিকিৎসাসেবার মান দিনদিন উন্নতি হওয়ার জায়গায় অবনতি হচ্ছে। এহেন অবস্থায় এটা তো আমি বা আমরা আশা করতেই পারি এদেশের নাগরিক হিসেবে সরকারের কাছে, চিকিৎসাসেবার মতো মৌলিক চাহিদা পূরণে সরকার আরও মনোযোগী হোক। সকল নাগরিকদের কল্যাণে সেবাখাতের উপর আরও গুরুত্ব দেওয়া হোক সরকারের পক্ষ থেকে। এতে সবদিক থেকে আমরা লাভবান হব। দেশের টাকা চিকিৎসার নামে বিদেশে যাবে না, আবার আস্থা বিশ্বাস ফিরে আসবে, সর্বসাধারণের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত হবে।

লেখক: পরিচালক, সিসিএন

সম্পাদনা: আশিক রহমান