বৃহস্পতিবার ১৪ ডিসেম্বর ২০১৭


যদি একদিন ফোন রিসিভ না করি অন্তত শখানেক মানুষ কষ্ট পাবে


আমাদের অর্থনীতি :
19.06.2017

ডা. জাকির হোসেন

সৃষ্টিকর্তা ক্লিনিক্যাল সাবজেক্ট এর চিকিৎসকদের লোড নেওয়ার ক্ষমতা কিভাবে যেন তাদের ইস্পাত দৃঢ় দেহের মাঝে প্রতিস্থাপন করে দেন। হুট করে কিছুদিন আগে সেন্ট্রাল হাসপাতালের ঘটনা পরবর্তী সময়ে আমার ওই বন্ধুটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চিকিৎসকদের গালি দিয়ে একটি স্ট্যাটাস দেন, আমার ফ্রেন্ড লিস্টে থাকায় সহসাই তার স্ট্যাটাস আমার দৃষ্টিগোচর হয়। খুব আক্ষেপ হলো তার স্ট্যাটাস দেখে। কেমন অকৃতজ্ঞ আমরা? সে তো মনে হয় জীবনে কখনো রাত নিশিতে তার ঘুম নষ্ট করে কোনো বিপদগ্রস্ত মানুষের ফোন রিসিভ করেছে বলে আমার মনে হয় না। যে লোকটি প্রায় আমার ঘুম নষ্ট করে, আমার ব্যস্ত জীবনের সময় নষ্ট করে প্রতিনিয়ত আমার সেবা নিয়েছে, সেই মানুষটিই স্ট্যাটাস দেওয়ার আগে একবারের জন্যও ভাবেনি বাংলাদেশের আর কোনো পেশার মানুষ নিজেদের সাংসারিক, পারিবারিক সামাজিক জীবন নষ্ট করে কখনই রাত-দিন অকাতরে সেবা দেয় না। শুধুমাত্র চিকিৎসা পেশায় নিয়োজিত চিকিৎসকেরা সীমিত সম্পদকে কাজে লাগিয়ে স্বাধীনতাত্তোর এই বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবাকে যেভাবে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন তা বিশ্বের ইতিহাসে বিরল। বলছি না এই পেশায় দুর্বৃত্ত নেই। এই শত শত ভাল পেশাজীবীদের মাঝে অনেক খারাপ মানুষজনও আছে। কিন্তু ঢালাওভাবে দেশের জন্য এই পেশার অবদানকে অস্বীকার করলে এই পেশার সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথ রুদ্ধ হবে।

আমাদের একটুখানি অসহযোগিতায় রোগীদের কষ্টের সীমা থাকে না এবং অনেকেরই মৃত্যু হয় যথাযথ চিকিৎসাসেবার অভাবে। আজকাল ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন জেলা শহরে এবং অন্যত্র এমন অনেক বেসরকারি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যেগুলোতে চিকিৎসাসেবা খুব ব্যয়বহুল। আবার এই সকল হাসপাতালগুলোর সাধারণ ব্যবস্থাপনা সরকারি হাসপাতালগুলোর থেকে অনেক বেশি উন্নত। আথিতিয়তা, আরাম-আয়েশ, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কোনোরকম ঘাটতি নেই। কিন্তু দারুণভাবে শ্রেণিবিভক্ত এই হাসপাতালগুলোতে টাকা-পয়সাওয়ালা লোক ছাড়া কারও চিকিৎসা নেওয়া কী সম্ভব? যারা এই কর্পোরেট হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা নেন, তাদের খরচ হয় লাখ লাখ টাকা। সাধারণ খেটে খাওয়া লোকজন সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে ওষুধ কেনা এবং যাতায়াতের খরচ বহন করতে গিয়েই সর্বস্বান্ত হয়ে যান। এই সকল দরিদ্র শ্রেণির লোকজনদের চিকিৎসার আশ্রয়স্থল হলো সরকারি হাসপাতাল। সেখানে চিকিৎসকগণ যথাসাধ্য চেষ্টা করেন রোগীর সামগ্রিক ব্যয় কম রাখার জন্য। এমন কোনো চিকিৎসক খুঁজে পাওয়া যাবে না যে অসহায় রোগীকে নিজের পকেটের পয়সা খরচ করে চিকিৎসা করেননি।

আমি আমার বন্ধুদের অনেককেই একটি কথা বলি যে যাকাত বা দান করার উত্তম স্থান হচ্ছে হাসপাতাল। যেখানে ফ্রি বেডে ভর্তি থাকে চিকিৎসা নিতে আসা অসহায় লোকজন। রোগীদের সার্বিক মঙ্গলের কথা চিন্তা করে আজকাল দূর-দূরান্ত থেকে আগত রোগীদেরকে বেশিরভাগ চিকিৎসকই তাদের ব্যক্তিগত সেল নম্বর দিয়ে দেন। যাতে করে সামান্য প্রয়োজনে হাসপাতালে এসে রোগীর বাড়তি ভাড়া গুনতে না হয়। আমার যে ফ্রেন্ড অকৃতজ্ঞভাবে অবিবেচক চিত্তে চিকিৎসকদের গাল দিয়ে স্ট্যাটাস দিয়ে এই দেশের গরিব-দুঃখী মানুষগুলোর আস্থার জায়গা নষ্ট করার চেষ্টা করেছে তাকে ওই দিনই আমার ফ্রেন্ড লিস্ট থেকে আনফ্রেন্ড করেছিলাম। ওই বন্ধুটিকে আবার আমার শেষ কথা উৎসর্গ করলাম। আজ যাকে বিবেকহীনভাবে গালি দিলে এই পেশার কোনো লোক একদিন ফোন রিসিভ না করলে অন্তত শখানেক মানুষ রোগব্যাধি নিয়ে কষ্ট পাবে।

লেখক: চিকিৎসক ও কলামিস্ট

সম্পাদনা: আশিক রহমান