সোমবার ২১ অগাস্ট ২০১৭


ধস শুধু পাহাড়ে নয়, হাড়ে হাড়ে


আমাদের অর্থনীতি :
19.06.2017

মাহফুজ জুয়েল

এই লেখাটার অনেক রকম শিরোনাম হতে পারত! হতে পারত: ‘আহারে! কত কষ্ট পাহাড়ে!’ অথবা ‘পাহাড়ের কান্না শুনতে কী পাও?’ অথবা ‘পাহাড় আমার, লাশের পাহাড়!’ লেখক যা লিখতে চাইবে, যা লিখবে, তা-ই তো লেখা হবে! পৃথিবীর অনেক কিছু এ রকম লেখালেখির মতো। যে যা লেখে তা-ই লেখা হয়। তাই, আমরা যা খোলা চোখে দেখতে পাই, ঘটনা-দুর্ঘটনা হিসেবে, তার অনেক কিছুই আমাদেরই লেখা!

এ লেখা যখন লিখছি তখন পর্যন্ত পাহাড় ধসে ১৪৭ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানে গত সোমবার মধ্যরাত থেকে মঙ্গলবার রাত পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে ওই পাঁচ জেলায় পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটে। একটি স্বনামধন্য পত্রিকার শিরোনাম পড়লাম: এ যেন যুদ্ধবিধ্বস্ত এক জনপদ। ওই পাঁচ জেলার রাস্তাঘাট, ঘরবাড়ি, ব্যবসা-বাণিজ্য, জীবনযাপন; কিছুই আর আগের মতো নেই। পত্রিকার তথ্যানুসারে, এর মধ্যে ‘রাঙামাটির সড়কব্যবস্থার ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ২৪২ কিলোমিটার দূরত্বের সাতটি সড়কের ১৪৫টি স্থানে পাহাড়ধস হয়েছে। প্রধান সড়কটির (রাঙামাটি-চট্টগ্রাম) দুটি অংশে সড়কের অস্তিত্বই নেই।’

পাহাড়ের ওই ধস, গণমৃত্যু, বিভীষিকা; সবই আমাদের নিজ হাতে লেখা। এখানে আমাদের মানে মানুষের; মানুষের মানে আমাদের রাষ্ট্র ও রাজনীতির! হ্যাঁ, আমাদের রাজনীতির লোকেরা নিজ হাতে পাহাড়ের পা-ুলিপি লিখেছেন। তারা যা যা লিখেছেন, আমরা তা তা-ই দেখতে পাই পাহাড়ে। লংগদুর শত শত আদিবাসী গ্রাম পোড়ানোর ওই আগুন, ঘরবাড়ি মানুষপোড়া কয়লা, ওই লুটপাট, গুম-দখল-হত্যা; আর এই পাহাড় কাটার ধুম, বারোমাসি মৌসুম, উৎসব-মচ্ছব; আর এই পাহাড়ধসের গণকবর; সবই আমাদের স্বরচিত নৃশংসতা। আর ধস শুধু পাহাড়ে নয়, আমাদের হাড়ে হাড়ে!

‘পাহাড়ি উধাও হলে, পাহাড় বগলে’ রাষ্ট্রপ্ররোচিত এই হীনভাবনায় যারা তাড়িত, তাদের জন্য আত্মহত্যা অবধারিত। পাহাড় আর পাহাড়িরা প্রকৃতির প্রকৃত সন্তান। প্রকৃতির বিকৃতি না করে, ধ্বংস না করে, তার অংশ হয়ে তারা বেঁচে থাকে। আর এ রকম পাহাড় প্রকৃতি কোনো দেশ রাষ্ট্র ভূ-খ-ের বিষয়মাত্র নয়, তা মূলত পুরো পৃথিবী নামের গ্রহটির ব্যাপার। সে এক মহাপরিকল্পনা মহা নকশার অবিকল্প অবকাঠামো বা সহজ সুন্দর স্থাপনার মতো। তাই যেমন হওয়ার কথা তেমনই হয়েছে পাহাড়, পাহাড়ের মানুষ, গাছপালা, পশুপাখি, পোকামাকড়, ওদের সবার জীবনযাপনের ধরন-ধারণ। এর মধ্যে সমতলের রাক্ষুসে পশ্চিমা মন নিয়ে পাহাড় ‘খেতে’ চাইলে, পেতে চাইলে, প্রকৃতি তো বসে থাকবে না, প্রকৃতি তার প্রকৃত আচরণই করবে! সেই আচরণ প্রতিশোধ মনে হতে পারে, কিন্তু তা মানবীয় লোভের মতোই ভুল ধারণা, প্রকৃতি মানুষের মতো এত ক্ষুদ্র বা হীন নয়, যে মানুষের মতো এত ক্ষুদ্র বা হীনভাবে ভাববে, হিংসা-প্রতিহিংসায় প্রতিশোধ নেবে। মানুষের ওই ধ্যান-জ্ঞান নেই বলেই সে সবাইকে তার নকল ভাবে! এমনকি ঈশ্বরকেও সে এভাবেই তার মতো ছোট করে! যা বলা দরকার, পাহাড় কাটার নামে গণকবর কাটা বন্ধ হোক। রাষ্ট্রের টনক নড়ুক। মানুষের বিবেক জাগুক। বন্ধ হোক নানামুখী গণআত্মহত্যা।

লেখক: কবি, সাংবাদিক ও আন্দোলনকর্মী

সম্পাদনা: আশিক রহমান