রবিবার ২৩ জুলাই ২০১৭


মসজিদের মুনাফা


আমাদের অর্থনীতি :
14.07.2017

 

া মাহফুয আহমদ

 

আজ প্রিয় পাঠকদের জন্যে ব্যতিক্রমধর্মী কিছু বাণিজ্যিক চুক্তি এবং বিশাল মুনাফার কথা লিখতে চাই। তবে এসব বিশেষ কিছু স্থানের সঙ্গে বিধিবদ্ধ। শুধু তারাই এসব বুঝতে পারবে, যাদের রয়েছে উচ্চাভিলাষ, যারা ক্লান্ত হয় না, বিরক্ত হয় না, যারা ক্রুদ্ধ হয় না আবার নিরাশও হয় না। পালনকর্তার রহমত থেকে পথভ্রষ্টরা ছাড়া কে নিরাশ হয়? (সূরা আল হিজর: ৫৬) এসব মুনাফা কোম্পানি বা ফাউন্ডেশনে পাওয়া যায় না।

ব্যাংক কিংবা বাজারে পাওয়া যায় না। কেননা এগুলো বিশেষ ধরনের বিরাট লাভজনক কিছু বাণিজ্যিক চুক্তি; যার ঘোষণা দিয়েছেন মানবতার মুক্তির দিশারী প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। সেগুলো গ্রহণ করেছেন সাহাবায়ে কেরাম। তাবিয়িগণ সেগুলো আঁকড়ে ধরেছেন। আমাদের পূর্বসূরিগণ ওগুলোতে প্রতিযোগিতা করেছেন। সেই মুনাফা হচ্ছে আল্লাহর ঘরের মুনাফা, মসজিদের মুনাফা। রুকু ও সিজদাকারী, সালাত ও ইবাদত আদায়কারী আল্লাহর প্রিয় বান্দাগণই সেই মুনাফাগুলো লাভ করে। ওই অপার্থিব মুনাফা তাদেরকে পার্থিব মুনাফা থেকে বিমুখ করে দেয়। বস্তুত সকাল-বিকাল তাসবিহের পুঁজি দ্বারা তারা আল্লাহর সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি করে। ফলশ্রুতিতে বিশাল মুনাফা লাভ করে। বিরাট মূল্য তার গ্রহণ করে, যার নাম পুরুষত্ব। আল্লাহ তাআলা বলেন, আল্লাহ যেসব গৃহকে মর্যাদায় উন্নীত করার এবং সেগুলোতে তাঁর নাম উচ্চারণ করার আদেশ দিয়েছেন, সেখানে সকাল ও সন্ধ্যায় তাঁর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে; এমন পুরুষেরা, যাদেরকে ব্যবসা-বাণিজ্য ও ক্রয়-বিক্রয় আল্লাহর স্মরণ থেকে, নামায কায়েম করা থেকে এবং যাকাত প্রদান করা থেকে বিরত রাখে না। তারা ভয় করে সেই দিনকে, যেদিন অন্তর ও দৃষ্টিসমূহ উল্টে যাবে। (তারা আল্লাহর পবিত্রতা ঘোষণা করে) যাতে আল্লাহ তাদের উৎকৃষ্টতর কাজের প্রতিদান দেন এবং নিজ অনুগ্রহে আরও অধিক দেন। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা অপরিমিত রুজি দান করেন। (সূরা আন-নূর: ৩৬-৩৮)

এবার প্রশ্ন আসতে পারে, এতো মুনাফা অর্জন কীভাবে সম্ভব?! উত্তরে বহু উপায় উল্লেখ করা যেতে পারে:

১. সকাল-বিকাল মসজিদে গমন। যে ব্যক্তি সকাল-বিকাল নিয়মিত মসজিদে যাবে সে আল্লাহর পক্ষ থেকে আপ্যায়নের মুনাফা অর্জন করবে। হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, যে ব্যক্তি সকালে ও সন্ধ্যায় (পাঁচ ওয়াক্ত সালাতে) মসজিদে যাতায়াত করে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাতে মেহমানদারী প্রস্তুত রাখেন। (সহিহ বুখারি: ৬৩১)

২. মসজিদে জামাতের সঙ্গে সালাত আদায়ে যতœবান হওয়া। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রা.)  থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, একাকী সালাত আদায়ের চেয়ে জামাতে সালাত আদায় করাতে সাতাশ গুন সওয়াব বেশি পাওয়া যায়। (সহিহ বুখারি: ৬১৯, সহিহ মুসলিম: ৬৫০)

৩. ঘরে উযু করা, মসজিদের উদ্দেশে বের হওয়া এবং চলার পথে অধিক ধাপ হওয়া। হযরত সালমান ফারসি (রা.)  থেকে বর্ণিত, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, যে ব্যক্তি ঘরে উত্তমভাবে উযু করে মসজিদে এলো, সে যেন আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাত করতে আসলো। আর মেহমানের সম্মান করা তো মেজবানের ওপর জরুরি। (তাবারানি: ৬১৩৯) মুহাদ্দিস নুরুদ্দিন হায়সামি রাহ. বলেন, এর সনদ সহিহ। (মাজমাউয যাওয়াইদ: ২/১১৪, হাদিস: ২০৮৭)

হযরত আবু হুরায়রা (রা.)  থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, তোমাদের কেউ নিজ ঘরে কিংবা বাজারে সালাত আদায় করার চেয়ে জামাতে সালাত আদায় করাতে সাতাশ গুন সওয়াব বেশি হবে। সে যখন উত্তমভাবে উযু করে সালাতের উদ্দেশ্যে মসজিদে আসে; একমাত্র সালাতই তার লক্ষ্য- তবে তার প্রতিটি পদক্ষেপে একটি সওয়াব লিখা হবে এবং একটি গুনাহ মাফ করা হবে। তোমাদের কেউ যতক্ষণ সালাত আদায় করে একই জায়গায় বসে থাকে ততক্ষণ ফিরিশতাগণ তার জন্যে দুআ করতে থাকেন, ইয়া আল্লাহ! তার ওপর দয়া করো, রহম করো; যতক্ষণ না লোকটি উযু ভঙ্গ করে কিংবা কাউকে কষ্ট দেয়। তোমাদের কেউ যদি শুধু সালাতের জন্যে অপেক্ষায় থাকে তবে এই সময়টাও সালাতের মধ্যে (সওয়াবের বিবেচনায়) গণ্য হবে। (সহিহ বুখারি: ২০১৩)

৪. মসজিদে এক সালাত আদায় করে পরবর্তী সালাতের জন্যে অপেক্ষা করা। হযরত আবু হুরায়রা (রা.)  থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, আমি কি তোমাদের বলে দিব না যে, কিসের দ্বারা আল্লাহ মানুষের গুনাহ মুছে দেন এবং মর্যাদা বৃদ্ধি করে দেন? সাহাবিগণ বললেন, হ্যাঁ বলুন, হে আল্লাহর রাসূল! তিনি বললেন, কষ্ট সত্ত্বেও পূর্ণভাবে উযু করা, অধিক পদক্ষেপে মসজিদে যাওয়া এবং এক সালাত শেষ হওয়ার পর আরেক সালাতের প্রতীক্ষায় থাকা। আর এটাই হচ্ছে রিবাত বা প্রস্তুতি। (তিনবার তিনি একথা বললেন)। (সহিহ মুসলিম: ২৫০)

৫. মসজিদ আবাদ করা, মসজিদ নির্মাণ করা অথবা নির্মাণকাজে অংশগ্রহণ করা। আল্লাহ তাআলা বলেন, নিঃসন্দেহে তারাই আল্লাহর মসজিদ আবাদ করবে, যারা ঈমান এনেছে আল্লাহর প্রতি এবং শেষ দিনের প্রতি আর কায়েম করে সালাত এবং আদায় করে যাকাত; আল্লাহ ব্যতীত আর কাউকে ভয় করে না। অতএব, আশা করা যায়, তারা হেদায়েত প্রাপ্তদের অন্তর্ভূক্ত হবে। (সূরা আত তাওবাহ: ১৮)

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)  থেকে বর্ণিত, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, যে আল্লার সন্তুষ্টির উদ্দেশে মসজিদ তৈরি করলো আল্লাহ তাআলা তার জন্য জান্নাতে মসজিদের মত একটি ঘর তৈরি করে দিবেন। (তিরমিযি: ২৯২)

৬. মসজিদে সবসময় আসা-যাওয়ার অভ্যাস করা। হযরত আবু সাঈদ খুদরি (রা.)  থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, তোমরা যদি কোন ব্যক্তিকে মসজিদে আসতে অভ্যস্ত দেখ, তবে তার ঈমান আছে বলে সাক্ষ্য প্রদান করো। কেননা আল্লাহ তাআলা বলেন, নিঃসন্দেহে তারাই আল্লাহর মসজিদ আবাদ করবে যারা ঈমান এনেছে আল্লাহর প্রতি ও শেষ দিনের প্রতি এবং কায়েম করেছে সালাত…. সূরা আত তাওবাহ: ১৮। (সুনানে তিরমিযি: ২৬১৭)

এজন্যে আমাদের মসজিদগুলোতে কিছু বিষয়ভিত্তিক দরস থাকা চাই। যেমন, দরসে কুরআন, দরসে হাদিস, দরসে ফিকহ ইত্যাদি। তা হতে পারে প্রত্যহ নির্দিষ্ট এক সালাতের পর অথবা সাপ্তাহিক, পাক্ষিক, মাসিক কিংবা বিশেষ উপলক্ষে। মসজিদের ইমাম, স্থানীয় কোনো বিজ্ঞ আলিম কিংবা বাহির থেকে আমন্ত্রণ করে বিশেষ কোনো নির্ভরযোগ্য আলিমের দ্বারা এ কাজগুলো আঞ্জাম দেয়া যেতে পারে। তা ছাড়া যারা মসজিদের বিভিন্ন দায়িত্বে রয়েছেন তাদের জন্য উচিত হলো, প্রত্যেকটি মসজিদে এক একটি পাবলিক লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা করা। সাধারণ মানুষের উপযোগী দেশীয় ভাষার নির্ভরযোগ্য গ্রন্থগুলো জোগাড় করা।