শুক্রবার ২৪ নভেম্বর ২০১৭


পৃথিবী থেকে জীবনের অস্তিত্ব মুছে যাওয়ার আশঙ্কা খুবই কম


আমাদের অর্থনীতি :
18.07.2017

মুজতাহিদ ফারুকী : একটি বিশালাকারের গ্রহাণু যদি আমাদের পৃথিবীকে আঘাত করে তাহলে সঙ্গে সঙ্গে লাখ লাখ প্রাণি মারা যাবে। কিন্তু এর পরিণতি হবে আরও বেশি ভয়াবহ। সুনামি, ভূমিকম্প এবং সূর্যকে ঢেকে ফেলার মতো বিপুল ধূলির মেঘ পৃথিবীকে আচ্ছন্ন করে ফেলবে। যার ফলে বছরের পর বছর ধরে ফসল ফলবে না এবং প্রাণিরা গণহারে বিলুপ্ত হয়ে যাবে।

সাড়ে ছয় কোটি বছর আগে এমনই একটি গ্রহাণুর আঘাতে পৃথিবী থেকে ৭৫ শতাংশ প্রাণি বিলুপ্ত হয়ে যায়। তবে সত্যি সত্যিই এই গ্রহের সব প্রাণি বিলুপ্ত হতে হলে এমন একটি বিপুল শক্তিশালী জ্যোতির্পদার্থবিদ্যাগত ঘটনা ঘটতে হবে যার ফলে বিশ্বের মহাসমুদ্রগুলোর পানি ফুটন্ত অবস্থায় নিঃশেষ হয়ে যাবে। নতুন এক গবেষণায় একথা বলা হয়েছে। গবেষণায় বলা হয়, এ ধরনের ঘটনার ফলে সৃষ্ট উত্তাপ এবং বৈশ্বিক বিকীরণ পৃথিবীকে এমনকি টার্ডিগ্রেডদের জন্যও টিকে থাকা অসম্ভব করে তুলবে। টার্ডিগ্রেড হলো অত্যন্ত বিরূপ পরিস্থিতিতেও টিকে থাকতে সক্ষম এযাবৎকালে আবিষ্কৃত সবচেয়ে শক্তপ্রাণের অতিসূক্ষ্ম একটি জীবাণু।

সৌর জগতের বাইরের কোনো নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে প্রদক্ষিণরত গ্রহ সম্পর্কিত বিদ্যার (এক্সোপ্লানেট) বিশেষজ্ঞ, প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর জশুয়া উইন বলেন, গবেষকরা একটি বড় প্রশ্ন নিয়ে এগিয়েছেন যে, জীবন আসলে কতটা স্থিতিস্থাপক? তারা পৃথিবীর সব মহাসমুদ্রকে শুকিয়ে ফেলার জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি উৎপন্ন হওয়ার বিষয়টি সামনে রেখে একটি হিসাব নিকাশ করেন।

গবেষকরা হিসাব কষে দেখেছেন যে, সব মহাসমুদ্রের পানি ফুটিয়ে নিঃশেষ করে ফেলার জন্য যে শক্তির প্রয়োজন হবে সেটা সারা বিশ্বের মানুষ পুরো এক বছরে যে পরিমাণ জ্বালানি ব্যবহার করে তার প্রায় একশ গুণ বেশি অর্থাৎ (১০০ডিগ্রি সেলসিয়াস ঢ ১০২২ জুলস)। এটি এক অবিশ্বাস্য রকমের বিশাল পরিমাণ। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন যে, সৌর জগতের সবচেয়ে বড় গ্রহাণু ভেস্ট্যা বা প্যালাসের সমান আকারের গ্রহাণুর আঘাতেই কেবল ওই পরিমাণ শক্তি উৎপন্ন হতে পারে। ১৮০২ সালে আবিষ্কৃত গ্রহাণু প্যালাসের পরিধি ৩২৫ মাইল বা ৫২৩ কিলোমিটার। বিজ্ঞানীরা গত শুক্রবার সায়েন্টিফিক রিপোর্ট নামের সাময়িকীতে এই গবেষণার ফলাফল তুলে ধরেন। অন্য আর যে কারণে পৃথিবীতে উল্লেখিত পরিমাণের শক্তি উৎপন্ন হতে পারে সেটা হলো, বাইরের মহাকাশে সুপারনোভা নামে পরিচিত তারকার বিস্ফোরণ অথবা গামা রশ্মির বিস্ফোরণ।

তবে এগুলোর কোনোটারই ঘটার সম্ভাবনা এই মুহূর্তে নেই বলে জানিয়েছেন গবেষণাকর্মের লেখক, হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যোতির্পদার্থবিদ এভি লোয়েব। তিনি জানান, উল্লিখিত আকারের গ্রহাণুর অস্তিত্ব থাকলেও সেগুলো আমাদের দিকে আসছে না। তাছাড়া পৃথিবীর সব পানি বাষ্পীভূত করে ফেলার মতো শক্তি উৎপন্ন করতে হলে আমাদের খুব কাছে সুপারনোভার বিস্ফোরণ হতে হবে। এটা হতে হবে পৃথিবী থেকে ০.১৩ আলোকবর্ষ দূরত্বের মধ্যে অর্থাৎ সৌরজগতের সবচেয়ে কাছে যে সুপারনোভা রয়েছে তার চেয়েও প্রায় ৩০ গুণ কাছে বিস্ফোরণ ঘটতে হবে। আর পৃথিবী থেকে সব পানি নিঃশেষ করে দেয়ার মতো গামা রশ্মির বিস্ফোরণ ঘটার আশঙ্কা প্রায় শূন্য। সুতরাং পৃথিবী নামের এই গ্রহ থেকে জীবনের অস্তিত্ব মুছে দেওয়া খুবই কঠিন, বললেন ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যোতির্বিজ্ঞানী গ্রেগরি লফলিন।

বিজ্ঞানীরা টার্ডিগ্রেড সম্পর্কেও তথ্য দিয়েছেন। টার্ডিগ্রেড হলো পানিতে বসবাসকারী একটি আণুবীক্ষণিক জীব যা Ñ২৭২ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত ঠা-া এবং ১৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উত্তাপে, যখন বিশ্বের অন্য সব প্রাণি মরে যাবে, বেঁচে থাকতে পারে। শুধু তাই নয়, পানির ভালুক নামে পরিচিত এই জীবাণুটি বাইরের মহাকাশে পুরোপুরি শূন্যতার মধ্যেও বেঁচে থাকে। এমনকি মহাসাগরের তলদেশে পানির যে চাপ তার চেয়ে ৬ গুণ চাপে এবং মানুষের জন্য প্রাণঘাতী মাত্রার বিকীরণের চেয়ে হাজার হাজার গুণ বেশি মাত্রার বিকীরণেও টার্ডিগ্রেডরা মরে যায় না। এর পেছনে রয়েছে এমন একটি জীবতাত্ত্বিক কৌশল যার মাধ্যমে টার্ডিগ্রেডরা নিজের দেহের ডিএনএ মেরামত করে নিতে পারে। এই কৌশলটি বিজ্ঞানীদের কাছে এখনও অজ্ঞাত। তবে এই জীবাণুটিও পানির বাইরে দীর্ঘ সময় ধরে সুতীব্র উত্তাপ ও বৈশ্বিক বিকীরণের প্রভাব থেকে টিকতে পারবে না কিংবা বহির্মহাকাশে অন্তহীন সময় ধরে বাঁচতে পারবে না।

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মহাবিশ্ব গবেষক ডেভিড স্লোয়ান বলেন, এসব গবেষণার ফলাফল কেবল যে পৃথিবীকে কেন্দ্র করেই কাজে লাগবে তাই নয়। এগুলো আমাদেরকে বহির্বিশ্বের প্রাণিদের সম্পর্কে জানার সুযোগ করে দিতে পারে। আমরা কোথায় কোথায় জীবনের অস্তিত্ব অনুসন্ধান করবো তারও আভাস দেবে এই গবেষণার ফলাফল। আর বিজ্ঞানী লোয়েব বলেন, পৃথিবীতে প্রাকৃতিক বা মানুষের সৃষ্ট যে কোনো মহাবিপর্যয় যেমন বৈশ্বিক উষ্ণতা বা পারমাণবিক যুদ্ধ থেকেও জীবনের অস্তিত্ব সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হবে না এমনটা আশা করাই যায়। তিনি বলেন, ভবিষ্যতে আমরা রাজনীতিতে যত ভুলই করি না কেন, পৃথিবীতে জীবনের অস্তিত্ব সম্ভবত টিকে থাকবেই। সূত্র : সায়েন্স ম্যাগাজিন