রবিবার ২২ অক্টোবর ২০১৭


বাংলাদেশি রোগীরা যা দেখেন ভারতের সিএমসি হাসপাতালে!


আমাদের অর্থনীতি :
19.09.2017

দীপক চৌধুরী, ভেলোর, ভারত থেকে

বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর কত সংখ্যক বা কী পরিমাণ রোগাক্রান্ত মানুষ সিএমসি হাসপাতালে (ভেলুর) আসে এর সঠিক পরিসংখ্যান কতৃপক্ষ দিতে পারেননি। তবে তাদের অনুমান তিন লাখের বেশি তো হবেই। রোগাক্রান্ত ঠাকুরগাঁয়ের পিয়াশ চন্দ্র, আব্দুল আলীম, রবিউল হেসেন, মুন্সীগঞ্জের পিয়ার মিয়া, আমজাদ আলী, আব্দুল হক, সোবাহান, রাজধানী ঢাকার আসলামসহ কয়েকজন ক্ষুব্ধ রোগী সম্প্রতি সিএমসির ওপিডি বিল্ডিংয়ে দাঁড়িয়ে প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করে বললেন, এখানে কিভাবে এসেছি এর রয়েছে নানা কারণ, দীর্ঘ ইতিহাস। বাংলাদেশের চিকিৎসাপদ্ধতির প্রশ্নের সঙ্গে জড়িয়ে আছে অনেক জিজ্ঞাসা। তারা বলেন, আমরা শুরুতেই এখানে আসিনি। বহু কষ্টে, বহু অর্থ খরচের পর আসতে বাধ্য হয়েছি খ্রিশ্চিয়ান মেডিকেল কলেজে ( সিএমসি)। তাদের কেউ আছেন একমাস ধরে, কেউবা কমবেশি সময় ধরে। মুন্সীগঞ্জের আব্দুল হক ক্ষোভ প্রকাশ করলেন সাংবাদিকদের ওপর। তার বক্তব্য এরকম, ‘সাংবাদিকেরা রাজনীতির খবর লিখেন, মন্ত্রী-মিনিস্টারের খবর লিখেন। কিন্তু চিকিৎসার নামে বাংলাদেশে যে অরাজকতা চলছে তা লিখেন না, লুটপাট-দুর্নীতির কথা লিখেন না। চিকিৎসার নামে ঢাকা সিটির এক শ্রেণির ডাক্তার শুধু টাকা কামাচ্ছেন, রোগীদের ধোঁকা দিচ্ছেন। তার অভিযোগ, ডাক্তাররা জেনেই তা করছেন। মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলা চলছে, দেখার যেন কেউ নেই। গ্যাস্ট্রো এন্টারোলজির এই রোগী জানালেন, ঢাকার এক নামকরা চিকিৎসক তার লিভার নষ্ট হয়ে গেছে জানিয়ে অপারেশনের জন্য দশ লাখ টাকা চান, না হলে তার বাঁচার আশা নেই এমন মন্তব্য করেন। অবশেষে এখানে আসেন। শুধু ওষুধ খেয়েই এখন ভালো হওয়ার পথে। খরচ সর্বসাকুল্যে চুয়াল্লিশ হাজার রুপি। সিএমসিতে না এলে আন্দাজ করতে পারতেন না জানালেন রাজধানীর যাত্রাবাড়ির মোহাম্মদ শাহজাহান। সম্প্রতি এখানে তার সঙ্গে কথা হয়। তিনি বললেন, ঢাকায় চিকিৎসকরা আমার স্ত্রীর দু’বছর চিকিৎসা করেছেন। খরচ হয়েছে ডাক্তারের পেছনে তিন লাখ বত্রিশ হাজার টাকা। অবশেষে তারা জানালেন, তোমার স্ত্রীর জরায়ুতে টিউমার হয়েছে। অপারেশন লাগবে। দুই দফায় টাকা দিলেও চলবে, তবে কমপক্ষে পাঁচ লাখ টাকা লাগবে। শাহজাহান সিএমসিতে এসেছিলেন এক বন্ধুর পরামর্শে। অপারেশন দরকার পড়েনি। টিউমারের অস্তিত্বও নেই। ওষুধে স্ত্রী ভালো। সিএমসি সংলগ্ন বাটা শো-রুমে জুতা কেনার সময় এমন কাহিনী জানালেন তিনি। তার স্ত্রীও মহাখুশি। জানালেন, ঢাকায় ফিরেই মামলা করবেন সংশ্লিষ্ট ডাক্তারের বিরুদ্ধে। চিকিৎসা ব্যবস্থায় ভুক্তভোগীরা প্রচ- ক্ষুব্ধ উল্লেখ করে কিডনির আরেক রোগী আনজীর আহমদ বললেন, বাংলাদেশে সর্বত্র ব্যয়বহুল চিকিৎসাপদ্ধতি। সরকারি হাসপাতালগুলোর আচরণ আমলাতন্ত্রের মতো। সুচিকিৎসার জন্য নয়, ব্যবসার জন্য রোগীকে হাতিয়ার করা হয়। এক শ্রেণির ডাক্তার ব্যবসাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে থাকেন বলে মনে করেন তিনি। এখানে আসা রোগী ও অর্ধশতাধিক রোগাক্রান্ত নারী-পুরুষ এবং তাদের সঙ্গে আসা অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলে এমন অনেক তথ্য পাওয়া গেছে- যা প্রায় একইরকম। শতাধিক রোগীর ইতিহাস এবং ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, রাজশাহী, খুলনা, বরিশালেরর বিভিন্ন হাসপাতালে তাদের বিভ্রান্ত করার কৌশল একইরকমের। ভুক্তভোগীরা জানান, তারা নানাবিধ কষ্ট স্বীকার করে আসেন সুচিকিৎসার জন্য। তুলনা করে তারা দেখেছেন, কম আর্থিক খরচে জটিলব্যাধিতে আক্রান্তরাও সুস্থ হয়ে বাংলাদেশের বাড়িতে ফিরেছেন।  সিএমসি অর্থাৎ খ্রিশ্চিয়ান মেডিক্যাল কলেজটি পাশের দেশ ভারতের তামিলনাড়ুর ভেলোরে অবস্থিত। কলকাতা থেকে আসা আশি জন রোগীর সঙ্গে কথা হয়। তারাও কলকাতায় চিকিৎসায় সীমাহীন অনিয়মের কথা বলেছেন। কলকাতার হাওড়া রেল-জংশন থেকে চেন্নাই বা কাটপাডি রেলস্টেশন হয়ে ভেলুর এসেছেন তারা। বাংলাদেশিদের জন্যও এ রুট।  সিএমসি থেকে প্রতিদিন প্রায় ৮ হাজার রোগী চিকিৎসা নিয়ে থাকে বলে কতৃপক্ষ দাবি করে থাকেন। জানতে চাইলে, হাসপাতালের এক কর্মকর্তা জানান, এখানে আউটডোরে ৮ হাজার এবং ইনডোরে ২ হাজার রোগীর চিকিৎসা করা হয়। হাসপাতালে রয়েছে ১৪৪ টি বিশেষজ্ঞ বিভাগ। জানতে চাইলে নিউরো মেডিসিন অ্যান্ড সার্জারি ইউনিটের একজন অধ্যাপক বললেন, রোগী আবেগের বশবর্তী হয়ে অনেক কথা বলবেন, ডাক্তারদের তা শোনার ধৈর্য থাকতে হবেই। চিকিৎসা শুরু করার আগের দায়িত্ব অনেক বেশি।

সিএমসিতে চিফ সিকিউরিটি, সিকিউরিটি অফিসার, সিকিউরিটি সদস্য মিলে তিনশ চল্লিশ জন। তারা দায়িত্ব পালনে এতোই দক্ষ যে, কর্মটাকে তারা প্রধান ইবাদত মনে করেন।  গাজিপুর থেকে আসা মো. কবির হোসেন ১২ সেপ্টেম্বর আইএসএস বিল্ডিংয়ে দাঁড়িয়ে জানালেন, একমাস দশদিন অতিবাহিত করেছেন। এরমধ্যে এক্স-রে, রক্তপরীক্ষা, এমআরআইসহ বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর তিনি সম্পূর্ণ সুস্থ। অর্থপেডিক বিভাগে হয়েছে চিকিৎসা। তার খরচ হয়েছে ইন্ডিয়ান এক লাখ বিশ হাজার রুপি। পা হারাতে হয়নি। ঢাকার একটি নামকরা প্রাইভেট হাসপাতাল বলেছিল, চিকিৎসার জন্য সাড়ে আট লাখ টাকা দরকার হবে। হাসপাতালের ওপিডি বিল্ডিংয়ের তৃতীয় তলায় দাঁড়িয়ে ১১ সেপ্টেম্বর কথা হয় চট্টগ্রাম থেকে আসা জব্বারের সঙ্গে। জানালেন গলায় টিউমার থাকায় এলাকার একজনের পরামর্শে এখানে আসা। তার ভাষায়, অনেক বড় বিপদ থেকে আল্লাহ বাঁচিয়েছেন। আমাকে চাঁটগায়ের একটি ক্লিনিক অপারেশন করার নামে মেরে ফেলত।

আন্তর্জাতিক পেসেন্টদের জন্য আলাদা লাইন আছে। ইংরেজী ও হিন্দী ভাষা না জানায় খানিকটা ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছিল জানিয়ে কুমিল্লার আবুল হাসেম বললেন, কাউন্টার কর্মচারীরা ডাক্তারদের মতো সাহায্যের হাত বাড়ালে সমস্যা হবে না। তিনি জানান, তার কানের রোগ নিয়ে বাংলাদেশের অধ্যাপক ডাক্তার প্রাণ গোপাল দত্ত যা বলেছিলেন এখানের ডাক্তাররাও তাকে এসব পরামর্শ দিয়েছেন। তাই তিনি দেশে ফিরে যাবেন প্রাণ গোপালের কাছেই। ভুক্তভোগীদের মতে,  সিএমসির চিকিৎসকদের সবচে বড়গুণ তারা রোগীদের আপন করে নিতে সময় দেন। সাধারণ মানুষ বা রোগীর জন্য ভাষা এখানে প্রধান সমস্যা। কিন্তু চিকিৎসকদের কাছে এসব কোনো সমস্যা নয়, প্রয়োজনে তারা বাঙালি সহকর্মীর সাহায্য নেন। সিএমসির ইন্টারনেল মেডিসিনের অধ্যাপক ডা. রোনাল্ড এলবর্ট জানালেন, রোগ নির্ণয়ের আগে কোনো ওষুধ নয়, সবধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা আগে। এর জন্য প্রয়োজনে দীর্ঘ সময় থেকে রোগীরা সহযোগিতা করেন।

সিএমসিতে সরজমিনে দেখা গেছে, প্রতিদিন এখানে শতাধিক রোগী পাওয়া যায় সিএমসির জনসংযোগ বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, ‘ট্যুরিস্ট’ ভিসায় ভারত ঢুকেছেন, কিন্তু চিকিৎসা নিচ্ছেন কোনো না কোনো রোগের। এখানে বাংলাদেশি কবির হোসেন টাঙ্গাইলের মানুষ। নিজ ও আত্মীয়দের প্রয়োজনে তিনবার এসেছেন সিএমসিতে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তর যুবক। জানতে চাইলে বললেন, বাংলাদেশে ভালো ভালো বহু ডাক্তার আছেন। কিন্তু সেখানে রোগ নির্ণয়ের যুগোপযোগী ইকুয়েপমেন্ট নেই, আছে দুর্নীতি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমকে সবচেয়ে বেশি নজর দিতে হবে চিকিৎসা ক্ষেত্রে। দরকার হলে চরম কঠোর হতে হবে। এটা তার পরামর্শ। কবির দেখেছেন, সরকারি হাসপাতালে আধুনিক চিকিৎসাযন্ত্রপাতি বিদেশ থেকে আনা হলেও তা সঠিকভাবে অপারেট বা পরিচালিত করার দক্ষ লোক নেই।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক, কলামিস্ট ও গল্পকার

সম্পাদনা: আশিক রহমান