বৃহস্পতিবার ১৪ ডিসেম্বর ২০১৭


উপমহাদেশের শারদীয় দুর্গোৎসব


আমাদের অর্থনীতি :
30.09.2017

 

আশালত বৈদ্য

 

দেবী দুর্গা হলেন শক্তির রূপ, তিনি পরমব্রহ্ম। সনাতন ধর্মশাস্ত্র অনুসারে দেবী দুর্গা দূর্গতিনাশিনী বা সকল দুঃখ দুর্দশার বিনাশকারিনী। পুরাকালে মহিষাসুরের অত্যাচারে স্বর্গ থেকে দেবতারা বিতাড়িত হয়েছিল। তখন সকল দেব-দেবতাদের সমর্থনে ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহেশ্বর এর শরীর থেকে আগুনের মত তেজরশ্মি একত্রিত হয়ে বিশাল এক আলোকপূঞ্জে পরিণত হয়। ঐ আলোকপুঞ্জ থেকে আবির্ভাব হয় দেবী দুর্গার। দশ হাতে দশ অস্ত্র নিয়ে মহিষাসুর বধের মাধ্যমে শান্তি ফিরে আসে স্বর্গে।

দেবী দুর্গা ত্রি-নয়না বলে তাকে ত্রৈম্বক্যে বলা হয়। তার বাম চোখ হলো বাসনা (চন্দ্র), ডান চোখ কর্ম (সূর্য) ও মধ্য চোখ হলো জ্ঞান (অগ্নি)। দুর্গার দশ বাহুতে যে দশটি অস্ত্র রয়েছে সেই অস্ত্রসমূহও বিভিন্ন প্রতীকের ইঙ্গিত করে। তীর-ধনুক দেবীর শক্তিমত্তার প্রতীক। মায়ের হস্তে ধৃত বজ্রাগ্নি হলো ভক্তের সংকল্পের দৃঢ়তা। দুর্গার হাতের পদ্ম বা পঙ্কজ অর্থ হলো পদ্ম যেমন কাদামাটির ভেতর হতে অনাবিল হয়ে ফোঁটে, তেমনি দেবীর উপাসকরাও যেন লোভ-লালসার জাগতিক কাদার ভেতর হতে আত্মার বিকাশ ঘটাতে পারে। দেবীর তর্জনীতে ধরা সুদর্শন চক্র তার শুভতার লালন ও অশুভের বিনাশের ইচ্ছার প্রকাশ। দেবী দুর্গার হাতে ধরা তলোয়ার জ্ঞানের ইঙ্গিত ও ত্রিশুল হলো সত্ত্ব, রজঃ ও তমঃ গুণের প্রকাশ। সনাতন শাস্ত্র মতে, দৈত্য, বিঘœ, রোগ, পাপ ও ভয়, শত্রুর হাত থেকে যিনি রক্ষা করেন, তিনিই দেবী দুর্গা।

দুর্গাপূজা প্রথম শুরু হয়েছিল কবে, কখন, কোথায় তা জানা যায়নি। দ্রাবিড় সভ্যতায় ভারতের মাতৃতান্ত্রিক দ্রাবিড় জাতির মধ্যে মাতৃদেবীর পূজার প্রচলন ছিল। সিন্ধু সভ্যতায় (হরপ্পা ও মহেঞ্জোদারো সভ্যতা) দেবীমাতা, ত্রিমস্তক দেবতা, পশুপতি শিবের পূজার প্রচলন ছিল।তবে কৃত্তিবাসের রামায়নে বর্ণিত আছে, শ্রী রামচন্দ্র কালিদহ সাগর (বগুড়া) থেকে ১০১টি নীলপদ্ম সংগ্রহ করে সাগর কূলে বসে বসন্তকালে সীতাকে উদ্ধারের জন্য সর্বপ্রথম দুর্গোৎসবের (বাসন্তি পূজা বা অকাল বোধন) আয়োজন করেছিলেন। মারকেন্দীয়া পুরান মতে, চেদী রাজবংশের রাজা সুরাথা খ্রীস্ট্রের জন্মের ৩০০ বছর আগে কলিঙ্গে (বর্তমানে উরিষ্যা) নামে দুর্গাপূজা প্রচলন করেছিলেন। যদিও প্রাচীন উড়িষ্যার সাথে নেপালের পূজার কোনো যোগসূত্র আছে কিনা জানা যায়নি।

ইতিহাস ঘেটে যতটুকু জানা যায়, মধ্য যুগে বাংলা সাহিত্যে দুর্গাপূজার অস্তিত্ব ছিলো। ১১শ শতকে অভিনির্ণয়-এ, মৈথিলী কবি বিদ্যাপতির দুর্গাভক্তিতরঙ্গিনীতে দুর্গা বন্দনা পাওয়া যায়। ১৫১০ সালে কুচ বংশের রাজা বিশ্ব সিংহ কুচবিহারে দুর্গাপূজার আয়োজন করেছিলেন। ১৬১০ সালে কলকাতার বারিশার রায় চৌধুরী পরিবার প্রথম দুর্গাপূজার আয়োজন করেছিল বলে ধারণা করা হয়। ১৭৯০ সালের দিকে এই পূজার আমেজে আকৃষ্ট হয়ে পশ্চিম বঙ্গের হুগলি জেলার গুপ্তি পাড়াতে ১২ জন বন্ধু মিলে চাঁদা তুলে প্রথম সার্বজনীন ভাবে আয়োজন করে বৃহৎ দুর্গা উৎসব, যা বারোইয়ার বা বারবন্ধুর পূজা নামে ব্যাপক পরিচিতি পায়।

বাংলাদেশের সাতক্ষীরার কলারোয়ার মঠবাড়িয়ার নবরতœ মন্দিরে ১৭৬৭ সাল থেকে দুর্গাপূজা হয় বলে লোকমুখে শোনা যায়। ঢাকেশ্বরী মন্দির চত্বরে আছে দুই ধরনের স্থাপত্যরীতি মন্দির। প্রাচীনতমটি পঞ্চরতœ দেবী দুর্গার, যা সংস্কারের ফলে ঐতিহাসিক সৌন্দর্য্য হারিয়ে গেছে। মন্দিরের প্রাচীন গঠনশৈলী বৌদ্ধ মন্দিরের মত। ধারণা করা হয়, দশম শতকে এখানে বৌদ্ধ মন্দির ছিল যা পরে সেন আমলে হিন্দু মন্দির হয়েছিল এবং ১১শ বা ১২শ শতক থেকে এখানে কালী পূজার সাথে দুর্গাপূজাও হত।

ইতিহাসবিদদের মতে, প্রায় সাড়ে পাঁচশো বছর আগে রমনায় কালী মন্দির নির্মিত হয়েছিল এবং এখানেও কালী পূজার সাথে দুর্গাপূজাও হত। আধুনিক দুর্গাপূজার প্রাথমিক ধাপ ১৮শ শতক থেকে দুর্গাপূজায় নানান দেশিয় বাদ্যযন্ত্রের সূচনা হয়। পাটনাতে ১৮০৯ সালের দুর্গাপূজার জল রঙের ছবি পাওয়া গিয়েছে, যা এখনো ভারতের রাষ্ট্রিয় সংগ্রহশালায় সংরক্ষিত।

উড়িষ্যার রামেশ্বরপুরে একই স্থানে ৪০০ শত বছর ধরে সম্রাট আকবরের আমল থেকে দুর্গাপূজা হয়ে আসছে। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে দুর্গা স্বাধীনতার প্রতীক হিসাবে জাগ্রত হয়। বিংশ শতাব্দির প্রথমার্ধে এই পূজা ঐতিহ্যবাহী বারোয়ারী বা কমিউনিটি পূজা হিসাবে জনপ্রিয়তা লাভ করে। আর দেশ ভাগের পরপর এই পূজা পৃথিবীর অন্যতম প্রধান উৎসবের মর্যাদা পায়।

সাধারণত আশ্বিন মাসের শুক্ল পক্ষের ষষ্ঠ থেকে দশম দিন পর্যন্ত শারদীয় দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়। এই পাঁচ দিন যথাক্রমে দুর্গাষষ্ঠী, মহাসপ্তমী, মহাষ্টমী, মহানবমী ও বিজয়া দশমী নামে পরিচিত। আশ্বিন মাসের শুক্ল পক্ষটিকে বলা হয় দেবীপক্ষ। দেবীপক্ষের সূচনার অমাবস্যাটির নাম মহালয়া; এই দিন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা তাদের পূর্ব পুরুষদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। দেবীপক্ষের শেষ দিনটি হল কোজাগরী পূর্ণিমা। এই দিন লক্ষ্মী দেবীর পূজা করা হয়। কোথাও কোথাও ১৫ দিন ধরে দুর্গাপূজা পালিত হয়। সেক্ষেত্রে মহালয়ার আগের নবমী তিথিতে পূজা শুরু হয়। পশ্চিমবঙ্গের বিষ্ণুপুর শহরের মৃন্ময়ী মন্দির এবং অনেক পরিবারে এই রীতি প্রচলিত আছে। বাংলা ও ত্রিপুরাতে মহাসপ্তমী থেকে বিজয়া দশমী পর্যন্ত চার দিন সরকারি ছুটি থাকে। বাংলাদেশে বিজয়া দশমীতে সর্বসাধারণের জন্য এক দিন এবং হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের জন্য ৩ দিন সরকারি ছুটি থাকে।

বাংলা (পশ্চিমবঙ্গ) ও ত্রিপুরায় শারদীয় দুর্গাপূজা সবচেয়ে বড় সামাজিক ধর্মীয় উৎসব হিসাবে পালিত হয়। এ ছাড়াও পূর্ব ভারতের বা বাংলার কলকাতা, হুগলী, শিলিগুড়ি, কুচবিহার, লতাগুড়ি, বাহারাপুর, জলপাইগুড়ি, আসাম, বিহার, দিল্লি, উত্তর প্রদেশ, মহারাষ্ট্র, গোয়া, গুজরাট, পাঞ্জাব, কাশ্মীর, অন্ধ্র প্রদেশ, কর্ণাটক, তামিলনাড়-, কেরালায় ঘটা করে এই উৎসব পালন করা হয়। নেপালে ও কখনো তিনি মহামায়া, কখনো বা ঊমা, কখনো আবার মহিষাসুরমর্দিনী। এমনই বহু নামে মর্তে পূজিত হন দেবী দূর্গা। শক্তির আধার দেবী দুর্গাকে আরাধনার মাধ্যমেই প্রতিবছর শারদীয়া উৎসবে মেতে ওঠে বাঙালিরা।

মৃণময়ীর পুজা থেকে পেটপুজা, আলোর রোশনাই, বাহারি পোশাক কোনটারই কমতি থাকে না চারদিনের সার্বজনীন এই উৎসবে। আর এই উৎসব ঘিরে রয়েছে নানা মতবাদ নানা মতামত। পুরাণ ও দুর্গাপূজা ব্রহ্মার বরদান পেয়ে অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছিল অসুররাজ মহিষাসুর। যুদ্ধে অসুরবাহিনীর কাছে পরাস্ত হয়ে সিংহাসন হারিয়েছিলেন দেবতা ইন্দ্র। স্বর্গে দেবতাদের প্রবেশ নিষিদ্ধ হয়ে গিয়েছিল। সমস্যার সমাধানের জন্য ভগবান বিষ্ণুর দ্বারস্থ হন দেবতারা। কিন্তু কোনও মহিষাসুরকে রুদ্ধ করার কোনো কৌশল খুঁজে পাচ্ছিলেন না কেউই। কারণ ব্রহ্মার বরদান অনুযায়ী কোনো পুরুষ বা কোনো দেবতা মহিষাসুরকে বধ করতে পারবে না। সেই কারণেই অসুরিনধনে ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বরের ত্বেজ থেকে জন্ম হয় ময়ামাহার।

হিন্দুশাস্ত্র মতে, কাত্যায়ণ ঋষির আশ্রমে দূর্গার জন্ম হয়েছিল বলে তার আর এক নাম কাত্যায়ণী। আশ্রমেই শুক্লসপ্তমী, অষ্টমী ও নবমী এই তিনদিন আরাধনার মাধ্যমে দেবীর আবাহন করেন ঋষি কাত্যায়ণ। চতুর্থদিন অর্থাৎ দশমীতে মহিষাসুরবধ করেন দেবী। অকাল বোধন শরৎকালে আশ্বিন মাসে চিরাচিরত দূর্গাপুজো হয়ে থাকে তাই এই উৎসবের আর এক নাম শারদীয়া।

কিন্ত রাবণের সঙ্গে যুদ্ধে যাওয়ার আগে দেবী দূর্গাকে তুষ্ট করতে বসন্তকালেই দেবীর আবাহণ করেন অযোধ্যার রাজা রামচন্দ্র। অন্যসময়ে বা অকালে দেবীর বোধন হয় বলে এই পূজা অকাল বোধন নামেই পরিচিত। ১০৮টি নীলপদ্ম দিয়ে পুজো করলে দেবী প্রসন্ন হবেন একথা জানতেন রাম। আর তাই নীলপদ্মের সন্ধানে সারা পৃথিবী ঘুরে বেড়ান তিনি। কিন্তু ১০৭টি পদ্ম খুঁজে পান তিনি। বাকি একটি পদ্মের ঘাটতি মেটাতে নিজের একটি চোখ দেবীর কাছে সমর্পণ করার সিদ্ধান্ত নেন রাম। এহেন শ্রদ্ধায় সন্তুষ্ট হয়ে দেবী রামের সম্মুখে প্রকট হয়ে আশীর্বাদ দেন। যুদ্ধ শুরু হয় সপ্তমীতে। ভয়াবহ যুদ্ধ চলতে থাকে। অবশেষে অষ্টমী ও নবমীর সন্ধিক্ষণে রামের হাতে মৃত্যু হয় রাবণের। দশমীর দিন রাবণের শবদাহ করা হয়।

বাংলায় প্রথম দুর্গাপূজা

বাংলায় কবে ও কারা প্রথম দুর্গাপূজোর প্রচলন করেন তা নিয়ে অনেক মতভেদ রয়েছে। ইতিহাসের পাতা ঘেটে জানা যায় ১৫০০ সালে বাংলায় প্রথম দুর্গাপূজা হয়। দিনাজপুর ও মালদহের জমিদাররা প্রথম দুর্গাপূজার শুরুর পরিকল্পনা নেন।

কারও মতে, তাহেরপুরের রাজা কংসনারায়ণ প্রথম সাড়ম্বের দুর্গাপূজা শুরু করেন। কারও দাবি নদিয়ার ভাষানন্দ মজুমদার প্রথম শারদীয়া পূজার সূচনা করেন বাংলায়। বারোয়ারি পূজো ১৯১০ সালে প্রথম শারদীয়া পূজো জমিদার ও বাবু ঘরানার বাইরে বেরিয়ে সাবর্জনীন হয়ে ওঠে।

লেখক:বীর মুক্তি যুদ্ধা ও সম্মানিত  স্ট্রাষ্টি, হিন্দু ধমীয় কল্যাণ স্ট্রাস