রবিবার ২২ অক্টোবর ২০১৭


‘ব্লু-হোয়েল’ নামের আত্মঘাতী খেলাটা একটা বিশাল গুজব


আমাদের অর্থনীতি :
12.10.2017

খুবই সম্ভাবনা আছে ‘ব্লু-হোয়েল’ নামের আত্মঘাতী খেলাটা আসলে একটা বিশাল গুজব, এই নামে বাস্তবে কিছুর অস্তিত্ব নেই।

যার অস্তিত্ব নেই, তার আঘাতও কত বিপুল হতে পারে, তার নিদর্শন হলো সাম্প্রতিক সময়ের কতগুলো অসম্পর্কিত আত্মহত্যার ঘটনার সঙ্গে এর যুক্ততা বিষয়ক প্রতিবেদন। নিজ ত্বকে ধারাল ক্ষতে নীল তিমির ছবি এঁকে আত্মহত্যাকারী কিশোর-কিশোরীদের সংবাদ ছাপা হচ্ছে এখানে সেখানে। বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষকরা সতর্ক করছেন অভিভাবকদের, শিক্ষার্থীদের।

পঞ্চম শ্রেণি পড়ুয়া ভাস্তি এসে বললো : ‘কাকামনি তুমি কিন্তু ব্লু হোয়েল নামে কিছু খুঁজবা না’; তার শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে সবাইকে সতর্ক করেছেন এই আত্মঘাতী প্রাণঘাতী ক্রীড়া সম্পর্কে। উদ্বেগ আর আশঙ্কার এই সময়ে এটুকু আগাম ব্যবস্থা নেওয়া, সচেতনতা তৈরির চেষ্টা তো খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু উল্টো সম্ভাবনাও তো আছে, অস্তিত্বহীন এমন কিছু সম্পর্কে আরও কৌতুহল, আরও আগ্রহ তৈরি কি করছে এই পদক্ষেপটা? এবং কেউ কেউ কি আত্মহত্যা কিংবা আত্মধ্বংসী একটা প্রক্রিয়ার কল্পনায় তার পরিজন ও অন্যান্যদের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া ও চাঞ্চল্য নিয়েও রোমাঞ্চিত হবে না? বাস্তবে নিশ্চয়ই তাদের মাঝে খুব কম একটা অংশ এই রকম কিছু করত, যদি তেমন কিছুর অস্তিত্ব আদৌ থেকে থাকত।আসলে এই পুরো বিষয়টার মাঝে যা প্রকাশিত হয়, সেটা হলো শিশু-কিশোরদের একাকীত্ব এবং নিঃসঙ্গতা। কোনো ব্লু-হোয়েলের ডাক আসার আগেই কিশোর তরুণদের একটা বড় অংশের মাঝে দেখা দেওয়া নৈরাজ্য জানিয়ে দেয় বিচ্ছিন্নতা কত প্রকট হয়েছে। খুবই সম্ভব যে, বিশ্বজুড়ে শিশু ও কিশোর বয়েসীদের এই তীব্র অস্থিরতাই প্রকাশ পেয়েছে ব্লু-হোয়েল নামের একটা কাল্পনিক ধ্বংসবিলাসী খেলার কল্পনায়, যেখানে কয়েকজন নির্দেশকের হুকুমে খেলোয়ার উচ্চ থেকে উচ্চতর পর্যায়ের মারণঘাতী কার্য সম্পন্ন করে। এর জনপ্রিয়তাও হয়তো সেই বিচ্ছিন্নতা আর একাকীত্বের বাস্তবতাতেই ডালপালা মেলে শক্তিশালী দৈত্যের চেহারা পেয়েছে। সংবেদনশীল শিশুদের নিয়েই তো বেশি ভয়, দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য নিজের ক্ষতি তারা কম করে না!

শিশুরা ভালো থাকুক। মানুষের পরস্পরের মাঝে, আর মানুষ ও প্রকৃতির মাঝে যে বিচ্ছিন্নতার বোধ যে মাত্রায় আজকের দুনিয়ায় দৃশ্যমান, তার তুল্য ইতিহাসে কিছু নাই। নানান রন্ধ্রপথে সেই বিচ্ছেদই হানা দিয়ে আমাদের আক্রান্ত করে। এর নিরাময় সেই বিচ্ছিন্নতা দূর করার সংগ্রামেই একমাত্র মেলা সম্ভব।

আজ রাতে তিন শিশুকে নিয়ে ছাদে গিয়ে মাথা আউলানো চাঁদের নিচে তাদের আত্মহারা আনন্দ দেখে এইসব কথা মনে হলো। এদের মাধ্যে যে সবচেয়ে শিশু, বয়স মোটে ছয়, মেঘ আর চাঁদের লুকোচুরি নিয়ে, আর তার নিজের নড়াচড়ার সঙ্গে চাঁদেরও নিমিষেই সাড়া দেওয়ার আবিষ্কারে মুগ্ধতা দেখে মনে হলো, অভিভাবকদের কাছ থেকে যদি সময় কেড়ে না নেওয়া হতো, আর শিশুরা যদি নির্ভয়ে মাঠে খেলতে যেতে পারত, অতল সাগরের নিরীহ নীল তিমিও ঘরে ঘরে কোনো আতঙ্কের নাম হয়ে দেখা দিত না।

এই আতঙ্ক আমাদের ন্যায্য পাওনা। সভ্যতা তার দাম চুকাতে আসছে বারবার।

লেখক : কেন্দ্রিয় কমিটির সদস্য, গণসংহতি আন্দোলন/ফেসবুক থেকে